যেভাবে সন্তান দত্তক নেবেন

সন্তান সব মা-বাবার কাছেই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু কিছু ভাগ্যাহত মানুষ মা-বাবা ডাক থেকে বঞ্চিত হয়। কিছু মানুষের কোল আলোকিত করে না কোনো দেবদূত। সে প্রয়োজন থেকেই শুরু হয় দত্তক প্রথা। আর সন্তান না থাকা পরিবারগুলো সাধারণত পালনের জন্য অন্যের সন্তান গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ হওয়ার কারণে এখানে অসহায় শিশুর সংখ্যা অনেক। এসব শিশুর অনেককেই সন্তানহীন পরিবার পালনের জন্য গ্রহণ করে থাকে। অনেক পরিবার মানবিক দায়িত্ব মনে করেও এ ধরনের দু’একজন শিশুকে মানুষ করে থাকে। অনেকেই গরিব আত্মীয়-স্বজনের সন্তানকেও পালনের জন্য গ্রহণ করে থাকে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও দত্তক বা পালক সন্তান নেয়ার নিয়ম রয়েছে। সেসব নিয়মকানন ও দত্তক নেয়া শিশুটির নিরাপত্তার বিষয়গুলো জেনে নেব।

১. নিঃসন্তান দম্পতি ইচ্ছে করলে পালক সন্তানের পিতামাতা হতে পারেন। সেই দম্পতিকে মানসিক ও শারীরিক দিক থেকে সুস্থ হতে হবে। এছাড়া তাদের মাঝে পালক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে লালন-পালন করার মানসিকতা থাকতে হবে।

২. প্রবাসী বাংলাদেশিও পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের বসবাসরত দেশের সমাজকল্যাণ বিভাগে আবেদন করতে হবে এবং সেখান থেকে ছাড়পত্র নিয়ে সে দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে জানাতে হবে।

৩. বিবাহিত, কিন্তু স্বামী মারা গেছেন এবং দ্বিতীয় বিবাহে আগ্রহ নেই, তবে আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য আছে, এমন মহিলা পালক সন্তান গ্রহন করতে পারেন।

৪. কোন দম্পতির নিজের সন্তান বড় হয়ে গেছে কিন্তু তাদের সাথে থাকে না এমন দম্পতিও পালক সন্তান গ্রহন করতে পারেন।

৫. অবিবাহিত মহিলা যিনি বিয়ে করবেন না বলে ঠিক করেছেন, অথবা বিয়ের বয়সও নেই, কিন্তু আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তিনি পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারেন।

৬. সন্তান জন্মদানে অক্ষম দম্পতির মধ্যে যিনি সন্তান জন্মদানে সক্ষম, কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদে আগ্রহী নন, কিংবা দ্বিতীয় বিবাহেও আগ্রহী নন। তিনি পালক সন্তান গ্রহণ করতে পারেন।

৭. পালক সন্তান নিতে আগ্রহী পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী দম্পতির বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। তবে ৩৫-৪৫ বছর বয়সী দম্পতি বেশি গ্রহণযোগ্য।

পালক সন্তানের নিরাপত্তার জন্য করণীয় কর্তব্য :

পালক সন্তান যেহেতু আইনত কোনো পালক পিতা-মাতার সম্পতির উত্তরাধিকারী হতে পারে না, সেহেতু পালক সন্তানের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু কর্তব্য পালন করা উচিত। পালক সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ দিয়ে নিজ সন্তানের মতই যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। তাদের শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী হওয়ার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে পালক সন্তানকে নিজ সন্তানের মতো গড়ে তুলতে হবে।  নিজ সন্তানের মতো স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে লালন-পালন করতে হবে পালক সন্তানকেও।

আইনগত বৈধতা লাভের উপায় :

পালক সন্তানের পিতামাতা হওয়ার জন্য বাংলাদেশ বিধানে বৈধ কোনো আইন নেই। তবুও কোনো পরিত্যক্ত শিশুর অভিভাবক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারে। এজন্য আগ্রহী অভিভাবকদের যেসব বিষয় করতে হবে, সেগুলো হলো-

১. অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির জন্য নোটারি পাবলিক বা ম্যাজিট্রেট কোর্টের শুনানির আগে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে সেই শিশুটির জন্মদাতা পিতা-মাতা বা সংশ্লিষ্ট অভিভাবকের কাছ থেকে ‌‌‌’আপত্তি নাই’ সূচকপত্র গ্রহণ করতে হবে।

২. বৈধভাবে অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির জন্য পারিবারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। কারণ পারিবারিক সব সমস্যার সমাধান পারিবারিক আদালতই করে থাকেন। আদালত কর্তৃক অভিভাবকত্ব প্রাপ্তির পর দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পালক পিতামাতা সন্তানের বৈধ অভিভাবক হিসেবে গণ্য হবেন।

ধর্মীয় বিধান :
ইসলামে পালক সন্তান নেয়ার কোনো বৈধ বিধান নেই। কেউ পালক সন্তান গ্রহণ করলে ইসলাম সেই সন্তানকে তার সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে না। অর্থাৎ সেই সন্তানের জন্মদাতা পিতাই হলেন আসল পিতা। তবে যদি কেউ কোন গরীব শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে থাকেন এবং সে শিশু যদি তাকে বাবা বলে সম্মোধন করে, সেটা ইসলামে কোনো আপত্তি নেই। অন্যদিকে হিন্দু আইনের অধীনে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ ধর্মাবলম্বীদের সন্তান দত্তক নেয়ার বিধান রয়েছে।

দত্তক শিশু প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান :

বাংলাদেশে দুই হাজারেরও বেশি শিশুদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। এর সবগুলোই সামাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজ সেবা অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া পরিত্যক্ত ও অবহেলিত শিশুদের নিয়ে কাজ করছে বেশ কয়েকটি এনজিও প্রতিস্থানও। দেশের কম-বেশি সব শিশু ও নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে দত্তক সন্তানের খোঁজ মেলে। আগ্রহীরা তাদের বাসস্থানের আশপাশেই খোঁজ করেই এরকম পুনর্বাসন কেন্দ্র পেয়ে যাবেন। কারণ, এরকম পুনর্বাসন কেন্দ্র ১-৭ বছরের দুঃস্থ পরিত্যক্ত শিশুকে লালন-পালন করে থাকে। স্বামী পরিত্যক্তা অসহায় গর্ভবতী নারী, ধর্ষিতা বা গর্ভের সন্তানকে পিতৃপরিচয় দিতে চান না এমন গর্ভবতী নারীকে আশ্রয় দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে শিশুদের জন্য সরকারিভাবে দুটি ট্রেনিং ও পুনর্বাসন কেন্দ্র আছে। একটি ঢাকার অদূরে গাজীপুরে, অন্যটি গোপালগঞ্জে। আর রাজধানীর মিরপুর-৭এ বেসরকারিভাবে হিড বাংলাদেশ– সেন্টার ফর ট্রেনিং রিহ্যাবিলিটেশন অব ডেস্টিটিউট উইমেন নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে।

Facebook Comments