দুধের শিশুকে খুঁটিতে বেঁধে ট্রেনের নিচে মা

চারপাশে অসংখ্য মানুষ, কিন্তু
তাদের মধ্যে কোথাও মাকে
দেখতে না পেয়ে শরীরের পুরো
শক্তি দিয়ে চিৎকার করে
যাচ্ছে শিশুটি। তার ছোট্ট
শরীরটা রেললাইনের পাশে
সীমানা পিলারের সঙ্গে লাল
কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। একটু
দূরে রেললাইনে পড়ে আছে এক
নারীর ছিন্নভিন্ন দেহ। শিশুটির
বুকে সাঁটানো এক টুকরো কাগজে
তার বাবার মোবাইল ফোন নম্বর
লেখা। ওই নম্বরে ফোন করে
স্থানীয়রা জানতে পারে,
শিশুটির নাম মেঘলা, বয়স ছয় মাস।
রেললাইনে পড়ে থাকা নারীর
বিবরণ দিলে অন্য পাশ থেকে
নিশ্চিত করা হয়, তিনিই শিশুটির
মা। তার নাম পারুল বেগম (২৭)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়,
মেঘলাকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে
রেখে পারুল চলন্ত ট্রেনের
নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা
করেছেন। শনিবার
সকালে দিনাজপুরের বিরল
উপজেলার কাঞ্চন রেল জংশনের
সামান্য দূরে বাসিয়াপাড়া
এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পারুলের স্বামীর নাম রফিকুল
ইসলাম। তাঁদের বাড়ি
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ
উপজেলার কলেজপাড়ায়।
মেঘলা ছাড়াও এ দম্পতির আরো
দুটি সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে
রাসেল বোচাগঞ্জে কারিতাস
স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির
শিক্ষার্থী। তারপর আরেক
মেয়ে ইতি, সব শেষে মেঘলার
জন্ম। পারুলের বাবার বাড়ি
বোচাগঞ্জের ছাতইল ইউনিয়নের
যশোরপাড়ায়। স্বজনদের দাবি,
মেঘলার জন্মের পর থেকেই পারুল
মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল।
বেশ কিছুদিন ধরে তিনি বাবার
বাড়িতেই ছিলেন। ওই বাড়ি
থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব ৮-৯
কিলোমিটার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল
সকাল পৌনে ১০টার দিকে
কাঞ্চন রেল জংশন থেকে
সামান্য দূরে বাসিয়াপাড়া
এলাকায় ঠাকুরগাঁওমুখী কাঞ্চন
এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে ঝাঁপ
দিয়ে আত্মহত্যা করেন পারুল।
আশপাশের লোকজন দ্রুত কাছে
এসে দেখেন, মেঘলাকে লাল
রঙের কাপড় দিয়ে রেললাইনের
পাশের একটি সীমানা
পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা
হয়েছে। আর কাগজে বাবার
মোবাইল ফোন নম্বর লিখে
মেঘলার বুকে সেঁটে দেওয়া
হয়েছে। মেঘলার সামনে কিছু
মুড়ি ও একটি বোতলে সামান্য
পানি রাখা আছে।
ঘটনার পর প্রথমে অদূরে মাঠে
কর্মরত কয়েকজন কৃষক ছুটে এসে
পারুলের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখতে
পান। শিশুটিকেও উদ্ধার করেন
তাঁরা। খবর পেয়ে ছুটে আসে
আশপাশের মানুষ। পরম মমতায়
মেঘলাকে কোলে তুলে নিয়ে
কান্না থামানোর চেষ্টা করেন
তাঁরা। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে
সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে
দেখা যায়, লাশ হেফাজতে
নিয়ে পারুলের স্বজনের
অপেক্ষা করছেন রেলওয়ে থানা
পুলিশের উপপরিদর্শক জিয়াউল
হকসহ অন্যরা। এ সময় স্থানীয় একজন
বৃদ্ধার কোলে ছিল মেঘলা।
ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার করছিল
সে। বারবার নিজের আঙুল মুখে
পুরে ক্ষুধার কথা জানান
দিচ্ছিল সে।
রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক
জিয়াউল হক জানান,
দিনাজপুরের রেলওয়ে
মাস্টারের মাধ্যমে খবর পেয়ে
প্রথমে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে
পারুলের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার
করেন তাঁরা। মেঘলার বুকে
কাগজে লেখা মোবাইল নম্বরে
ফোন করে তার পরিচয় নিশ্চিত
হন তাঁরা। বোচাগঞ্জ পৌরসভার
৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর
জাহাঙ্গীর আলম লিটনকে সঙ্গে
নিয়ে দুপুর ২টার দিকে
ঘটনাস্থলে আসেন পারুলের
স্বামী রফিকুল ইসলাম। পারুলের
বোন সুফিয়াও খবর পেয়ে
ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তাঁরা লাশ
শনাক্ত করেন। উভয় পক্ষের
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে
ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ স্বজনদের
হাতে লাশ তুলে দেওয়া হয়। আর
মেঘলাকে দেওয়া হয়েছে তার
বাবার হেফাজতে। স্বজনরা
জানিয়েছে, পারুলের লাশ
দাফন হবে স্বামীর বাড়িতে।
সুফিয়ার বরাত দিয়ে উপপরিদর্শক
জিয়াউল হক জানান, মেঘলার
জন্মের পর থেকেই পারুল মানসিক
বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে
বোচাগঞ্জ পৌরসভার
কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম
লিটন জানান, মেঘলা ভূমিষ্ঠ
হওয়ার পর থেকে পারুল মানসিক
বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিলেন।
অসুস্থতার কারণে মাস দুয়েক ধরে
বাবার বাড়িতে ছিলেন
তিনি। তবে রোগের চিকিৎসা-
সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য
দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

Facebook Comments