একজন ফারুক ভাইয়ের বিসিএস-যাত্রা এবং আমি!!

হাসিব আল ফারাজি : একটা খাতা আর কলম নিয়ে চোখ বন্ধ করে নিজের নামটা লিখতে চেষ্টা করে দেখুন তো অন্ধকারে এই ছোট্ট কাজটিই ঠিকমত করতে কেমন লাগে…!
আমাদের সবার দৃষ্টিশক্তি আছে, তবু একটু আঁধারেই আমরা কেমন ভয় পেয়ে যাই…অথচ যাঁরা এই অক্ষমতা নিয়েও আলো জ্বালাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত, তাদের কী বলা যায়…?
হ্যাঁ তাঁরা আলো জ্বালাতে চায়, বিদ্যুৎশক্তি হয়তো তাঁদেরও আছে…. কিন্তু তার জন্য একটুখানি বর্তনী সংযোগের শক্তি প্রয়োজন, যে শক্তিটা হতে পারি আপনি আমি,আমরা!

৩৫ তম বি সি এস লিখিত পরীক্ষা ছিল গত বছরের 1 সেপ্টেম্বর থেকে। 13 অগাস্ট শ্রুতিলেখক মনোনয়নের শেষদিন !
সেদিনও অনেক বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন ফারক ভাই। নবম শ্রেণীতে থাকতে বিএনসিসি’র সদস্য থাকা অবস্থায় এক দুর্ঘটনায় উনার চোখদুটি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু অক্ষত ছিল তাঁর স্বপ্ন।
এসএসসি পাশ করেই বিয়ে করে ফেললেন। স্ত্রী পড়ে পড়ে শোনাত, আর উনি মনে রাখতেন। এভাবেই এইচএসসি পাশ। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম/সমাজকল্যাণ(not sure..ভুলে গেছি! ) থেকে অনার্স মাস্টার্স করেন তিনি।

এতগুলো বছর এত প্রতিকূলতা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, সমাজের অবজ্ঞা উপেক্ষা করে তিনি সেদিন আরেকটি জয়ের দ্বারপ্রান্তে; এমন সময় তাঁর দরকার একটু সহানুভূতি, আমাদের একটু সাহায্য, খুবই সামান্য একটু সাহায্য!

তিনি শ্রুতিলেখক পাচ্ছেন না। আমার সাথে কোন এক ভাবে উনার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। সে আরেক গল্প।

তিনি খুব করে চাইতেন আমিই যেন লিখিত পরীক্ষাটা দিয়ে দিই।
আমার দ্বিতীয় বর্ষের মিডটার্ম পরীক্ষা চলছিল তখন। ১-৭ তারিখে একটা পরীক্ষা পড়েই যাবে।
তবু তাঁর অসহায় মুখটির দিকে তাকিয়ে মনে হল আমি কি পারি না ওঁনার একটা বিজয়ের সাথী হতে? কেমন লাগবে আমার, যদি সামান্য এক শ্রুতিলেখকের অভাবে ওঁনার এতদিনের লালিত স্বপ্নটা নষ্ট হয়ে যায়? মেনে নিতে পারবো আমি!!?
ওঁনার স্বপ্নের ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টা না হয় আমিই এঁকে দিই…
আমি ই হয়ে গেলাম শ্রুতিলেখক।
পড়াশুনা তো দূরের কথা, এসময়টিতে উনি অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়েই অনেক ঝামেলা পোহাচ্ছেন। প্রেগন্যান্সির কারণে অসুস্থ স্ত্রী তাঁকে এতটুকু সাপোর্টও দিতে পারে নি।

আমাকে কয়েকটা বই দিয়ে গিয়েছিল প্রস্তুুতি নেয়ার জন্য।
বাংলা যাই লিখি তবু একটু লিখতে পারব! ম্যাথ নো প্রবলেম!
একরকম ছোটখাট বিজ্ঞানী তো হয়ে বসেই আছি!
English, বাংলাদেশ আর আন্তর্জাতিকের বই তিনটা নিয়েছিলাম।

আমি চরম ফাঁকিবাজ। সারাদিন ফেসবুকিং করি। নিজের মিডটার্মের জন্যই পড়ি না,আর উনার পড়া!!

২২ তারিখ ফোন দিলেন ফারুক ভাই। উনি নাকি দ্বিতীয় বাচ্চার বাবা হলেন সেদিন। অভিনন্দন।

আমার ডিপার্টমেন্টের স্মার্টেস্ট আর সবচেয়ে রাগী ম্যামের একটি মিডটার্মের ডেইট পড়ল লিখিত পরীক্ষার একই দিনে!
আমি কৃতজ্ঞ ম্যামের প্রতি, শুধু আমার জন্যই ডেইটটা চেইন্জ করেছিলেন উনি।

ফারুক ভাই আমার রুমে আমার বিছানাটিতেই পরীক্ষার কয়েকটা দিন থাকলেন।
একজন বেকার প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের জনক ছাপোষা মানুষের আর্থিক অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমেয়।
আমি এই কয়েকটা দিন সাধ্যমত উনাকে সাপোর্ট দিয়ে গিয়েছিলাম।
এমনও দুটি রাত পেয়েছিলাম যে আমি অন্য রুমে গিয়ে শুধু ঘুমিয়েছি, কিছুক্ষন পরেই তখন 4/4.5am উনি ফোন দিচ্ছেন ! প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে মনে মনে গজগজ করতে করতে কোন সমস্যা হলো কিনা আবার দেখতে এসে দেখি গোসল সেরে, রেডি হয়ে প্রবেশ পত্র হাতে বসে আছেন উনি!!

তখন খুব কষ্ট হতো উনাকে দেখে। মনটা খুব খারাপ হয়ে যেত।।!
পরীক্ষা কক্ষেও বিচিত্র অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার উনাকে নিয়ে। একদিন উনি ম্যাজিস্ট্রেটকে দপ্তরী ভেবে ধমক দিয়েও বসলেন!

কিছুদিন আগে উনার প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে চাকরিটাও হয়ে গেছে!!
আজ যখন উনাকে ফোন দিলাম,, রেজাল্ট জানলাম….. অভিনন্দন জানালাম।
ফোনের ও প্রান্তটা চুপ ছিল। আমি ঠিকই বুঝেছি…….. ফারুক ভাই কাঁদছেন!
কিছুক্ষণ পর ডাকলাম -ফারুক ভাই…….!!
উনি আমাকে ধন্যবাদ জানান নি, অভিনন্দনও না।
উনি শুধু চিৎকার করে কান্না জড়িত কণ্ঠে ইংরেজিতে প্রার্থনা করলেন…
Hasib, You must………………….
আমি কাঁদতে পারি না।
এত তুচ্ছ! ব্যাপারে কাঁদি কি করে!!!
I’m blessed……….
ফারুক ভাইয়ের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা!
দোআ করবেন যেন ভাইভা’তে খুব ভালো করে টিকে উনি খুব সুন্দর একটা চাকরি পান!
সেদিন আমি অনেক বেশি খুশি হবো যখন শুনবো, আমি নিশ্চিত হবো যে ওঁনার স্বপ্নের ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়টা আমিই এঁকে দিয়েছিলাম…

 

 

Facebook Comments