আমার কাছে এখনো ফোন আসে, আসবে—-

মোঃ রেজাউল করিম : কিছুদিন আগে এক ছাত্রী ফোন দিল,(ক্লাস সেভেনে পড়ে)স্যার এই Sentence দুটির Narration বলে দেন। আমি বাসে ছিলাম, চারপাশে অনেক শব্দ তবুও কষ্ট করে বুঝিয়ে দিলাম।বাসের অনেক মানুষ আড় চোখে তাকিয়ে ছিল।

এক ছাত্রকে অনেক বছর পড়িয়েছি, তার ফ্যামিলির সাথে ভালো সম্পর্ক। উনার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব আসলে আমাকে ছেলের বায়োডাটা দেখাত, স্যার দেখেনত এই ছেলে কেমন হবে, ছেলের এই চাকরিটা কেমন আরো অনেক কিছু।

এক মেয়ের বাপ বেঁচে ছিলনা, মা কষ্ট করে পড়াত। টেনে টুনে তাদের সংসার চলত। অনেক বছর তাকে ফ্রি পড়িয়েছি। শুধু নাস্তাটা খেতাম,অবশ্য না খেয়ে উপায় ছিলনা। হল থেকে পড়াতে যেতাম, এমনি বাজে খাবার খেয়ে দিন চলত তাই ক্ষুধা মেটাতে খেতাম। কারন এখানে আমি শিক্ষক।

কত অভিভাবক কত অজুহাতে টাকা কম দিয়েছে, মেরে দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। তাদের যে টাকা কম ছিলনা তা নয়। বরং যাদের টাকা বেশি ছিল তাদের দ্বারা এই কাজ বেশি হত। এক বড়লোক পরিবারে টিউশনি করতাম, ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে যখন যেতাম পানিও দিতনা। বাসায় ঢুকার আগে কলা রুটি কিনে নিয়ে ঢুকতাম, শুধু পানি চেয়ে নিতাম। কারন, এখানে আমি শিক্ষক।

এক ছেলে পরীক্ষার ফি না দিয়ে বন্ধুদের টাকা খরচ করে ফেলেছিল। বানা মা জানলে মারবে, তাই টাকা আমি দিয়েছিলাম। ফেরত চাইনি কোনদিন।

প্রতিদিন অনেক ফোন আসে। স্যার চাকরি পাচ্ছিনা, কিভাবে পড়ব, জব নিয়ে বলেন।অনেকের রিলেশন নিয়ে সমস্যা অনেকের আবার পারিবারিক সমস্যা। এড়িয়ে যেতা পারিনা।

আমার ডিপার্টমেন্টের এক ছেলে জটিল রোগে মারা গেল, চেয়ারম্যান স্যারের সাথে ছুটে গেলাম সবাই মিলে, ট্রেজারার স্যারকে ম্যানেজ করতে, টাকা ও এম্বুলেন্স আনার জন্য। নিজেরাও পকেট থেকে টাকা দিয়ে সাহায্য করলাম।

আপনি যদি ডাক্তারের কাছে, অথবা উকিলের কাছে অথবা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে যান তারা টাকা ছাড়া আপনার সাথে কথা বলবেনা। কিন্তু একজন শিক্ষক আপনার সাথে সারাজীবন বলবে। একজন ভালো শিক্ষক একটা বট বৃক্ষের মত, সারাজীবন ছায়া দিয়ে যায়। এরা সমাজ বা রাষ্টের জন্য স্থায়ী সম্পদ।

শিক্ষকরা এক বেলা কম খেয়ে থাকতে রাজি কিন্তু তার যে আপনার মত ছেলে মেয়ে আছে। আপনার ছেলে মেয়ের মত তারাও ভালো খেতে পরতে আবদার করে। সচিবের ছেলে মেয়ে যদি পাজেরো গাড়ি নিয়ে স্কুল-কলেজে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছেলে মেয়ে রিক্সা দিয়ে যেতে চাইলে দোষের কিছু???

সচিবের বউয়ের জন্য সরকারি বাড়ি-গাড়ি ফ্রি। শিক্ষকদের বউয়ের জন্য কি আছে???

আছে একটা জিনিস, সম্মান। সবাইকে বলে তার স্বামী বিশ্ববিদায়লয়ের শিক্ষক। টাকা পয়সা কম বেশি সবারই থাকে। কিন্তু সম্মান, ভালোবাসা সবাই চায়। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা শিক্ষকদের সহজাত বৈশিষ্ট্য ।

প্রভাষক, সমাজকর্ম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments