নানা সমস্যায় জর্জরিত এস. এম. সুলতান কমপ্লেক্স

উজ্জ্বল রায়, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি ঃ জীবিত সুলতান যেমন অবহেলিত ছিলেন মৃত্যুর পরও সুলতান কমপ্লেক্স সে ধরনের অবহেলা নিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে । এক যুগেও পূর্নতা পায়নি সুলতান কমপ্লেক্স। এখানে সুলতানের আকা মূল্যবান ছবি নষ্ট হতে চলেছে, জরাজীর্ন অবস্থায় রয়েছে বজরাটি, ১ জন লোক দিয়ে চলছে কমপ্লেক্সের কর্মকান্ড। সুলতানের পালিতকন্যা নিহারবালাও ভাল নেয়। আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায়ের পাঠানো তথ্য ও ছবির ভিত্তিতে জানা যায়, আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত সুলতান কমপ্লেক্স। ১২ বছর অতিবাহিত হলেও এটি পূর্নতা পায়নি আজ ২০০৩ সালে শহরের কুড়িগ্রামে পৌনে ২ কোটি  টাকা ব্যয়ে সুলতান কমপ্লেক্স তৈরী হয়। ২ একর ৫৭ শতক জমির উপর সুলতান কমপ্লেক্সটি নির্মিত হলেও অধিগ্রহণকৃত ৭৮ শতক জমির ৫ জন মালিকের ক্ষতিপূরণ অবমূল্যায়নের মামলার নিস্পত্তি না হওয়ায় কমপ্লেক্স এসব জমির মালিকানা এখনও হাতে পায়নি। ১ জন মালি কাম গার্ড দিয়ে চলছে বিশাল কমপ্লেক্সের আর্টগ্যালারী, যাদুঘর, ভ্রাম্যমান শিশুস্বর্গ আর শিশুস্বর্গ কেন্দ্রটি । ২০০৩ এর  জুন মাসে শিল্পকলা একাডেমী কমপ্লেক্সটি পরিচালনার জন্য কিউরেটর সহ ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়। প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ায় ৩ মাস পরে  বেতন না পেয়ে  সবাই কমপ্লেক্স ছেড়ে চলে যান। জীবিত অবস্থায় নিজের তত্ত্বাবধানে শিল্পী সুলতান তার নিজ অর্থে তৈরী করেছিলেন ইঞ্জিনচালিত একটি বজরা । তার স্বপ্ন ছিল এই বজরায় করে শিশুদের নিয়ে তিনি পানিতে করে ভেসে বেড়াবেন। এই শিশুরা প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করবে আর ছবি আকবে। চিত্রা নদীতে বজরাটি ভাসিয়েছিলেন তিনি । সেই বজরাটি আজ অবহেলায় চিত্রা নদীর পাড়ে পড়ে আছে । তার কাঠে ঘুন ধরে জরাজীর্ন অবস্থা । এটি সংরক্ষন অথবা পানিতে নামানোর কোন উদ্যোগই প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি । আগামী কয়েক বছরে সুলতানের এই বজরাটি একবারেই ধ্বংস হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে । কমপ্লেক্স এর আর্ট গ্যালারীতে ৩৮ ফুট লম্বা ‘ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম’,‘সভ্যতার ক্রমবিকাশ’,‘গাঁতা চাষ’সহ সুলতানের মোট ২৩টি ছবি রয়েছে। আর্টগ্যালারী তৈরী হবার পরে ৩ বছর ছবিগুলো ঘরের মধ্যে বন্ধ অবস্থায় ছিল। এতে অধিকাংশ ছবি  নষ্ট হয়ে যায় ।  যার মধ্যে মাত্র ২টি ছবি শিল্পকলা একাডেমী উদ্যোগে রেষ্টোরার (চিত্রকর্মের চিকিৎসক) এর মাধ্যমে সংস্কার করা হয় । বাকি ছবিগুলো অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় এবং সুলতানের অসমাপ্ত ছবিগুলো একেবারেই বিবর্ন হয়ে যাচ্ছে । জানা গেছে এখানকার আবহাওয়া অনুযায়ী এই গ্যালারী আরো উচু হওয়া উচিত ছিলো । শিল্পী সুলতানের ব্যবহার্য জিনিস পত্রের কিছু রয়েছে আর্টগ্যালারীতে আর বাকি কিছু তার পুরোনো একতলা ভবনে এলোমেলো অবস্থায়। একটি ঘরের মধ্যে শিল্পীর ব্যবহৃত খাট, আলনা, বাক্স, ড্রেসিং টেবিল স্টোর রুমের মতো পড়ে আছে ।  দর্শনার্থী এলেও এটা খোলা হয়না । যতেœর অভাবে প্রিয় এই শিল্পির ব্যবহৃত জিনিস গুলো আজ নষ্ট হতে চলেছে। কমপ্লেক্স এর নিরাপত্তার দায়িত্বে মাত্র ৩ জন আনসার ব্যাটেলিয়ান রয়েছে।  বাউন্ডারী দেয়ালের বাইরে  বজরা নৌকা আর শিশুস্বর্গ কেন্দ্রটি একেবারেই অরক্ষিত অবস্থায় থাকে । আনসার সদস্যরা কেবলমাত্র দেয়ালের ভিতরেই বসবাস করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন । চীরকুমার শিল্পী সুলতানের স্মৃতি বহন করে চলেছেন পালিত কন্যা নিহার বালা । সুলতানকে বিশ্ববরেন্য হতে যিনি সাহায্য করেছেন তাকে মোটামুটি সুলতান কমপ্লেক্সের বাইরে রাখা হয়েছে । জীবন্ত এই কিংবদন্তির অনেক আভিযোগ সরকারী কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। যে নিহারবালা সুলতানের কাছে কাটিয়েছেন সারাজীবন আজ তাকেই ঢুকতে দেয়া হয়না সুলতানের কবরের কাছে । প্রাচিরের পাশে একটি টিনশেড ঘরে কোন রকেমে থাকেন তিনি ।  তার বাড়ির সাথে সুলতান মাজারে যাবার যে রাস্তা ছিলো তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, বিদেশী মেহমান এলে তাকে দেখা করতে দেয়া হয়না এরকম সব অভিযোগ তার । তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে বেচে থাকা নীহারবালা  বাবা সুলতানের কাছে থেকে মরতে চান । মৃত্যুর পূর্বে সুলতানের স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন দেখে যেতে চান ৮১ বছর বয়সী প্রবীণ এই নারী। জেলা প্রশাসক ও সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোঃ হেলাল মাহমুদ শরীফ জানান, এস এম সুলতান এক জন বিশ্ববরেন্য শিল্পি। এখানে  জনবলসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকল সমস্যার সমাধান করা হবে সে ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দূরদুরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীরা সুলতান কমপ্লেক্সের এহেন দশা দেখে হতাশ হন । তারা সুলতান কমপ্লেক্সের পূনাঙ্গ রূপ এবং এখানে থাকবার ব্যবস্থা করাবার দাবী জানান । লোকবল বাড়িয়ে গুনী এই শিল্পীর চিত্রকর্ম আর যাদুঘরের সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নেবার দাবী সকলের ।  বিশেষ করে সুলতানের মূল্যবান সব ছবি এবং তার বজরাটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহন করে সুলতানের স্বপ্নকে আরো বহুদিন বাচিয়ে রাখতে চান তারা ।

Facebook Comments

Leave a Reply