নার্সের বাসায় অবৈধ ক্লিনিক; ডেলিভারির কারখানা

ডেস্ক: কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স মঞ্জুমা আক্তারের বাসায় অবৈধ ক্লিনিক চলছে। চিকিত্সক ছাড়া চলছে ওই ক্লিনিক। হাসপাতালের প্রসূতি মায়েদের ভাগিয়ে তিনি সেবার বিনিময়ে ব্যবসা করছেন। এ ছাড়া গর্ভপাতের ক্ষেত্রে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঞ্জুমা ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। সরকারি চাকরি করলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মাত্র ২০০ গজ পূর্বদিকে তিনি নিজস্ব বাড়িতে মিনি ক্লিনিক চালু করেছেন। পাঁচ বছর ধরে ওই ক্লিনিকে দিন-রাত অন্তঃসত্ত্বা রোগী দেখেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের দালালের মাধ্যমে বাসায় নিয়ে আসেন। তিনি সার্জন সেজে সন্তান প্রসব এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা ওএমআর (চৌম্বকীয় অনুরণনের ইমেজিং) করান।

বিশেষ করে অনৈতিকভাবে কেউ অন্তঃসত্ত্বা হলে মানসম্মানের ভয় দেখিয়ে বিপুল টাকায় চুক্তি করে গর্ভপাত করানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী হোসেনের ছেলে আলমগীর হোসেন অপু জানান, তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী তাহমিনা আক্তারকে গত ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় লাকসামের মমতাময়ী হাসপাতালের গাইনি চিকিত্সক পান্নাকে দেখান। তিনি আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পরামর্শ দেন। ডা. পান্নার নির্দেশনা অনুযায়ী একই হাসপাতালে ওই রোগীর আল্ট্রাসনোগ্রাম করান ডা. নুরউল্লাহ রায়হান। এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘বাচ্চার হার্টবিট ১৫০ বিপিএম, তবে নড়াচড়া নেই। মন্তব্য, বাচ্চার বয়স ৪০ সপ্তাহ, সংখ্যা ১, ভায়বল প্রেগন্যান্সি, নো মুভমেন্ট।’

এই রিপোর্ট দেখে ডা. পান্না রোগীর স্বজনদের বলেন, ‘বাচ্চা ভালো আছে। তবে নড়াচড়া না থাকায় সিজার করা ভালো হবে। সিজার করলে হাসপাতালে ভর্তি করান।’ এ সময় রোগীর এলাকার একজন পল্লী চিকিত্সকের পরামর্শে স্বাভাবিক প্রসবের আশায় রোগীকে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

আলমগীর হোসেন অপু বলেন, ‘ওইদিন স্ত্রীকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিত্সকের কক্ষে যাই। ওই কক্ষে আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তি হাসপাতালে এই মুহূর্তে ডাক্তার-নার্স কেউ নেই উল্লেখ করে আমাকে বলেন, আপনারা হাসপাতালের পূর্বদিকে নার্স মঞ্জুমার বাসায় যান। তিনি বাসায় রোগী দেখেন। আনোয়ারের কথামতো বাসার সামনে যেতেই নার্সের লোকজন আমাদের ওই নার্সের পাঁচতলা ভবনের নিচতলার ১ নম্বর কক্ষের চেম্বারে বসায়। তখন দুপুর ২টা।’

নার্স মঞ্জুমা পাশের কক্ষে এক গর্ভবতীর সন্তান প্রসব করাচ্ছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর মঞ্জুমা চেম্বারে এসে কাগজপত্র দেখে বলেন, ‘কী জন্য এসেছেন? আপনারা কি শিক্ষিত? বাচ্চা তো মৃত। চাইলে কন্ট্রাক করেন। সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মৃত বাচ্চা ডেলিভারি করে দেব। তবে ডেলিভারি করতে দেরি হইলে ঝামেলা করতে পারবেন না। কাউকে বলতে পারবেন না।’

অপু বলেন, ‘এ কথা শুনে স্বজনরা কান্নাকাটি শুরু করেন। সিজার থেকে বাঁচতে সরকারি হাসপাতালে এলাম। অথচ সরকারি হাসপাতালের নার্স বলছে, বাচ্চা মৃত। সাধারণ কেউ হলে নার্সের কথামতো সিদ্ধান্ত নিত। তবে আমি ফের মমতাময়ী হাসপাতালে যাই। পরে ডা. পান্নাকে সিজার করাতে বললাম। দুপুর আনুমানিক ২টা ৪৫ মিনিটে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে আমার স্ত্রী একটি সুস্থ, সুন্দর ও ফুটফুটে কন্যাশিশুর জন্ম দেন। একই সঙ্গে সুস্থ ছিল আমার স্ত্রীও।’

অপুর অভিযোগ পেয়ে এ প্রতিবেদক নার্স মঞ্জুমার রহমান ভিলার বাসায় যান। বাসার নিচতলায় গিয়ে দেখা যায়, তিনটি কক্ষের একটি মিনি ক্লিনিক রয়েছে। প্রথম কক্ষে নার্স মঞ্জুমার চেম্বার। যেখানে তিনি রোগী দেখেন। আর দ্বিতীয় কক্ষে রয়েছে তিনটি বেড। এ ছাড়া তৃতীয় কক্ষে রয়েছে একটি অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি)।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনি ওই রোগীকে আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করতে বলুন। অভিযোগ পেলে নার্সের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখব। তদন্তে সত্যতা পেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উল্লেখ্য, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় এক বাহরাইন প্রবাসীর স্ত্রী পরকীয়া সম্পর্কের জেরে ২৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা হন। পরে অন্যদের সহায়তায় ২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল নার্স মঞ্জুমার বাসায় যান। পরকীয়া প্রেমিকের অর্থের লোভে বাড়ির নিচতলায় নার্স মঞ্জুমা অবৈধভাবে ওই প্রবাসীর স্ত্রীর গর্ভপাত ঘটান। ওই প্রবাসী দেশে ফিরে কুমিল্লার বিজ্ঞ ১ নম্বর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আমলি আদালতে নার্স মঞ্জুমাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। মামলাটি বিচারাধীন।

Facebook Comments

Leave a Reply