প্রিয়নবীর হাতেগড়া মসজিদ

masjid_naডেস্ক রিপোর্ট : মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করে এসে মসজিদে নববি নির্মাণ করেন। পথে বনি সালেম পল্লীতে জুমাবার জুমার নামাজ আদায় করেন এবং জুমা শেষে তিনি রওনা করেন। তার উট মসজিদে নববির বর্তমান স্থানে এসে বসে পড়ে। এই স্থানটি ছিল খেজুর শুকানোর স্থান ও উট-বকরির আস্তাবল। দুইজন এতিম শিশু ছিল ওই জায়গার মালিক। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ১০ দিনারের বিনিময়ে ওই সম্পত্তি কিনেন। তারপর মসজিদ তৈরি করেন। তিনি এবং মোহাজের, আনসার ও সাহাবায়ে কেরাম মিলে মসজিদ তৈরি করেন।

হজরত আম্মার বিন ইয়াসার (রা.) ছিলেন মসজিদের প্রধান রাজমিস্ত্রি, ইঞ্জিয়ার ও নির্মাণ কৌশলী। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং নিজেও সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে ইট-পাথর বহন করেন। তিনি নিজ হাতে একটি পাথর দিয়ে মসজিদের ভিত্তিস্থাপন করেন। মসজিদের ভিত্তিতে পাথর, দেয়ালে ইট, চালে খেজুর পাতা ও সুঘ্রাণ এজখের ঘাস এবং খুঁটিতে খেজুর গাছ ব্যবহার করা হয়।

সৌদি আরবের আবহাওয়া অনেক গরম বিধায় চালের ওপর কাঁদা মাটির প্রলেপ দেয়া হয় ঠাণ্ডার জন্য। একবার বৃষ্টির পানিতে মসজিদের মেঝে কর্দমাক্ত হয়ে যায়। স্বয়ং হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কপাল ও দাড়ি মোবারকে কাদা লাগে। সাহাবায়ে কেরাম মেঝেতে পাথরের নুড়ি বিছিয়ে দেন।

প্রথম হিজরি সনে নির্মিত মসজিদের আয়তন ছিল ৮৫০.৫ বর্গমিটারের মতো। উচ্চতা ছিল ২.৯ মিটার। সপ্তম হিজরিতে খায়বার বিজয়ের পর ক্রমবর্ধমান মুসল্লির সঙ্কুলানের জন্য মসজিদকে সম্প্রসারিত করা হয়। তখন এর আয়তন দাঁড়ায় ২০২৫ বর্গমিটার এবং ছাদ ৭ গজ উঁচু করা হয়।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সময়ের মসজিদের সীমানা এখন পর্যন্ত চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। তুর্কি খলিফারা সেখানে লিখে রেখেছেন, ‘এটাই হলো মহানবী (সা.)-এর সময়কাল মসজিদের সীমানা।’ এ সময় মসজিদের ৩টি দরজা ছিল।
মসজিদের ভেতর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে, রিয়াজুল রওজা বা ‘বেহেশতের বাগান’ নামক জায়গাটি। রাওজার দৈর্ঘ্য ২২ মিটার ও প্রস্থ ১৫ মিটার। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্য স্থান হচ্ছে বেহেশতের বাগান।’ –সহিহ বোখারি ও মুসলিম

এখানে ইবাদত ও ইতেকাফের ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি।
বিভিন্ন সময় মসজিদে নববির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। যারা সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছেন, তারা হলেন—
১. হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.), ২. হজরত ওমর (রা.), ৩. হজরত ওসমান (রা.), ৪. খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালেক, ৫. খলিফা মাহদি, ৬. আশরাফ কায়েতবায়, ৭. সুলতান আবদুল মজিদ, ৮. বাদশাহ আবদুল আজিজ, ৯. বাদশাহ ফয়সল বিন আবদুল আজিজ, ১০. বাদশাহ খালেদ বিন আবদুল আজিজ এবং ১১. বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ।

বর্তমানে মসজিদের আয়তন হচ্ছে, ৯৮ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। মসজিদের ভেতরে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার মুসল্লি, ছাদের ওপর ৯০ হাজার মুসল্লি এবং আঙিনায় মোট ২ লক্ষ ৫০ হাজার মুসল্লি একই সময়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। বর্তমান সম্প্রসারিত আঙিনাসহ প্রায় ২০ লক্ষ মুসল্লি একই জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটি কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। ফলে গরমের সময় মুসল্লিদের কষ্ট করতে হয় না। আবার সকল মুসল্লি যেহেতু ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারেন না তাই ২৭টি গম্বুজ সরানোর জন্য শক্তিশালী মেশিন বসানো আছে। তার পাশাপাশি ৮টি ফোল্ডিং ছাতার সাহায্যে মাঝে মাঝে অক্সিজেন, বাতাস যাতায়াতের সুব্যবস্থা করা হয়। এতে ১০টি মিনার, ৮টি ফোল্ডিং ছাতা ও ২৭টি গম্বুজ আছে। এতে ৭টি প্রবেশপথ ও ৮২টি দরজা আছে।

মহানবী (সা.)-এর  হুজরা (বাসস্থান) মোবারকেই মহানবী (সা.)-এর পবিত্র দেহ মোবারক শায়িত আছেন। তার কবরটি লোহার জালি দ্বারা আবৃত এবং কবরের চার পাশে সীসা ঢালাই করে কবর মজবুত করা হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা কয়েকবার লাশ মোবারক চুরির উদ্যোগ নেয়ায় ওই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর পার্শ্বেই রয়েছে তার দুই সাহাবির কবর। তারা হলেন হজরত আবু বকর ও হজরত ওমর (রা.)। চতুর্থ কবরের স্থানটি আজ পর্যন্ত খালি পড়ে আছে। এখানে হজরত ঈসা (আ.) কে সমাহিত করা হবে।

আমাদের দেশ থেকে হজপালনের জন্য সৌদি গমনকারী হাজিরা সাধারণত মদিনায় আট দিন অবস্থান করেন এবং মসজিদে নববিতে একাধারে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সর্বাত্মক চেষ্টা চালান।

মদিনা থেকে ওহুদ পাহাড় ও ওহুদ যুদ্ধের স্থান, খন্দক যুদ্ধের স্থান, মসজিদে কুবা, মসজিদে কেবলাতাইন ও জান্নাতুল বাকি খুব কাছে। হাতে সময় থাকলে দেখে আসতে পারেন। চেষ্টা করলে মদিনায় কর্মরত আপনার পরিচিত কারও মসজিদে নববির প্রশাসনের পদস্থ কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে পারলে সংরক্ষিত বিশেষ কক্ষে প্রিয়নবী (সা.)-এর ব্যবহার্য দ্রব্যাদি- জুব্বা, পাগড়ি, আংটি, লাঠি, তৎকালীন বিভিন্ন বাদশাহ ও গোত্রপ্রধানদের কাছে লেখা মহানবী (সা.)-এর চিঠিপত্র ও সন্ধিপত্রের মূল কপিগুলো দেখার দুর্লভ সৌভাগ্য লাভ করতে পারবেন। যদিও এগুলো সাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

এ ছাড়া সময় থাকলে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, খেজুরবাগান, বাদশাহ ফাহাদ কোরআন প্রিন্টিং কমপ্লেক্স ঘুরে আসতে পারেন।

Facebook Comments

Leave a Reply