সেই মোনালিসার লিওনার্দো

মীর লিয়াকত
ভালোবাসা অমোঘ চিরন্তন। ভালোবাসার রূপের শেষ নেই। একেক সময় একেক রং। কখনো চোখের তারায় চেয়ে থাকে, কখনো মায়াবী হাসিতে, কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো গল্পে আবার কখনো ছবি আঁকতে। কখনো বছরের পর বছর অপেক্ষার পর ভালোবাসার রং ধরা দেয় চোখের আইরিশে। ভালোবাসার সবচেয়ে বড় রূপ সে কখনো কোন বাঁধ মানে না। কে, কখন, কোথায়, কিভাবে, কেন এসব প্রশ্নে’র উত্তর থাকে না। একটি মেয়ে হয়তো সে কারো বিবাহিত স্ত্রী সেখানেও যদি ভালোবাসার রঙ ফুটে ওঠে সে বাঁধাও মানতে চায় না নাছোড় বান্দা ছেলে।leonardo
লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির বিখ্যাত মোনালিসাও যেন তেমনি এক অপরূপ ভালোবাসা। প্রকৃত পক্ষে মোনালিসা ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক অভিজাত ব্যক্তির স্ত্রী। তার নাম ছিল লিজা। তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। মতান্তরে মোনালিসা ছিলেন জিয়োকান্ত নামে এক ধনী বৃদ্ধের তৃতীয় স্ত্রী। তার নাম ছিল মাদোনা এলিজাবেথ। অনেক মায়ামুখের অসংখ্য ছবি তুলির টানে ফুটিয়ে তুললেও ভিঞ্চির মন ভরেনি।
হঠাৎ একদিন ভিঞ্চির চোখ পড়লো এলিজাবেথের ঠোঁটের কোনে এক অদ্ভুত এক চিলতে হাসি। বিচিত্র এ হাসি মনে গেঁথে গেল ভিঞ্চির। হোক না অপরের স্ত্রী। ওর মন প্রান তো ভরিয়ে দিয়েছে সেই মায়াবী বিচিত্র হাসির পরশ। এই একটি হাসির জন্য ভিঞ্চি যেন অপেক্ষা করেছিলেন বছরের পর বছর। হৃদয় উৎসারিত ভালোবাসার রঙে আচড় দিলেন ভিঞ্চি। বছরের পর বছর সেই ঠোটের কোনে ফুটে উঠা হাসিটি সাজিয়ে নিলেন তার ক্যানভাস ও তুলিতে।
জগৎ অবাক চোখে দেখলো সেই কালজয়ী ছবি মোনালিসা। এর আগেও অবশ্য তিনি এঁকেছেন ভার্জিন অব দ্য রকস। মানবাত্তার চিরন্তন রূপ ফুটে ওঠা ঝুলে পড়া এক পর্বত। কিন্তু ভালোবাসার রঙে সাজানো সেই মোনালিসা হয়ে রইল চিত্র শিল্পের জগতে সর্বকালের সেরা সৃষ্টি।
দুনিয়া কাঁপানো ইতালীয় রেঁনেসার সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি ১৪৫২ সালে এক কুমারী নারীর গর্ভে জন্মগ্রহন করেন। এখানেও বিধাতার অমোঘ পরিহাস। তার উকিল পিতার নাম ছিল পিয়ারো এন্টানিও দ্য ভিঞ্চি। ছেলেবেলায় সঙ্গীতের প্রতি প্রবল আর্কষনে হাতে তুলে নেন বাঁশি। তাঁর বাঁশির সুর স্বর্গীয় এক অপরূপ মায়াজাল সৃষ্টি করে বিস্মিত করে তুলতো সকলকে। গানেও ছিল দরাজ কন্ঠ। কিন্তু লিওনার্দোর ঝোঁক ছবি আঁকার দিকে। কিন্তু বাবার অনুমতি ছাড়া তো তা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। একদিন তিনি লুকিয়ে কাঠের উপর শিং ওয়ালা এক ড্রাগনের ছবি একে আলো আধারির ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে একটা ছবি আঁকলেন।
ড্রাগনের চোখ থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে আগুনের শিখা, মেলে আছে হিংস্র দাঁতগুলো, নাক দিয়েও বেরুচ্ছে আগুনের তিব্র হল্কা। ছবি আকা শেষ করে তা ঘরে উপযুক্ত স্থানে রেখে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখলেন। দেখা যাক বাবা এসে এটা দেখে কী বলেন। আসলে বাবা পিয়ারের কোন আস্থাই ছিল না ছেলের প্রতিভার ওপর।
ঘরে ঢুকে ভয়ঙ্কর ড্রাগনের ছবি দেখে বাবা আকস্মিক চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। ভিঞ্চি বললেন ‘আমি মনে হয় আমার যোগ্যতার প্রমান দিতে সক্ষম হয়েছি’। এবার বাবা ছেলের প্রতিভার স্বীকৃতি না দিয়ে পারলেন না। আঠারো বছর বয়সে লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি তেরোক্কিয়োর চিত্র শিক্ষার স্কুলে ভর্তি হলেন। তেরোক্কিয়ো ছিলেন সে সময়ে ফ্লোরেন্সের সর্বশ্রেষ্ট শিল্পি। তেরোক্কিয়োর কাছে ছবির আঙ্কিক শিক্ষাই শুধু গ্রহন করেন নি, তিনি দুচোখ মেলে দেখতে শিখেছিলেন প্রকৃতির অপরূপ রূপলাবন্য, তার নি:সর্গ শোভা, দেখেছেন নদী স্রোতের মধ্যে জীবনের প্রবাহ। তাঁর কাছেই শিখেছেন কেমন করে মানবজীবনের গভীরে ডুব দিয়ে তার অপার রহস্যময়তাকে ফুটিয়ে তুলতে হয় রঙের তুলিতে। এই কারনেই লিওনার্দো তেরোক্কিয়োকেই তার গুরু হিসাবে স্বীকার করেছেন। দুবছর শিক্ষনবিশের কাজ শেষ করে লিওনার্দো স্থির করলেন নিজেই স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা করবেন।
শুধু ছবি আঁকতেই নয় জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ও রয়েছে তার অধ্যয়ন। তাঁর মধ্যে ঘটেছিল বিজ্ঞানী ও শিল্পির এক আশ্চর্য যুগলবন্দী। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, অংকশাস্ত্রবিদ, গায়ক, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, শরীরতত্ববিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, আবিষ্কারক, ষ্টেজ ডিজাইনার এবং খ্যাতিমান দার্শনিক। ছবির মধ্যে তিনিই বিশ্বে প্রথম চিত্রশিল্পী যিনি প্রথম ছবিতে শেডের কাজ প্রবর্তন করেন। ফ্লোরেন্সে অবস্থানকালীন সময়ে লিওনার্দো যে সমস্ত ছবি এঁকেছেন তার বেশির ভাগই ছিল প্রচলিত শিল্পরীতি থেকে ভিন্ন। এছাড়া তিনিই প্রথম শিল্পি যিনি প্রকৃতির ছবি আঁকার জন্য প্রকৃতির কাছে ছুটে যেতেন। চোখে যা দেখতেন তাই মনের গভীর ভালোবাসায় ফুটিয়ে তুলতেন। যেমন করেছিলেন তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি মোনালিসা। monalisa
১৪৮২ সালে তিনি মিলানে এলেন। এ সময় ভিউকের প্রাসাদে আয়োজিত এক সঙ্গীতানুষ্ঠানে বাঁশি বাজিয়ে সবাইকে অবিভূত করেন। স্বল্প পরিচয়েই ভিউক উপলব্ধি করেন কি অসাধারন প্রতিভার পুরুষ এই লিওনার্দো। মিলানের অধিপতি তাকে রাজদরবারে সভাসদ করে নিলেন। অধিপতি লুডোভিকোর সাহচর্যে লিওনার্দোর প্রতিভার আরও বিকাশ ঘটে। লিওনার্দো কল্পনা করতেন একটি আদর্শ শহরের। যে শহর হবে সবদিক দিয়ে আদর্শ ও সুন্দর। যেখানে সব মানুষের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ব্যবস্থা হলো। সেখান থেকে আবর্জনা যাবে সরাসরি নদীতে। লিওনার্দোর এই আদর্শ শহরের পরিকল্পনা সর্বকালের সর্বযুগে প্রযোজ্য। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে তিনি লুডোভিকের স্বর্গীয় পিতার ২৬ ফুট উচ্চতা সম্পন্ন এক বিশাল মুর্তি প্রায় আট বছরের পরিশ্রমে স্থাপন করেন। যেখানে একটি ঘোড়ার উপর বসেছিলেন রাজা। এসময় ম্যাডোনা নামের আরেক বিখ্যাত ছবি আঁকেন। তখনি লুডোভিকো লিওনার্দোকে যীশুর জীবনের কোন বিষয় নিয়ে ছবি আঁকার গুরুভার অর্পণ করেন। চিত্রশিল্পের জগতে র্সবকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি আঁকলেন লিওনার্দো। এ ছবিটি ছিল গোটা দুনিয়ার অবিস্মরনীয় অংকন। ছবিটিতে ছিল যীশু তার বারোজন শিষ্যসহ শেষ ভোজে বসেছেন। তার দুপাশে ছয়জন করে মোট বার জন। সামনে প্রশস্থ সুদৃশ্য টেবিল। পেছনের জানালা দিয়ে হাল্কা আলোর বিচ্ছুরন এসে পড়েছে। যীশু বলছেন
‘তোমাদের মাঝে কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে  ধরিয়ে দেবে।’
শিষ্যরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সবাই আলোচনারত তাদের মধ্যে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। বৈজ্ঞানীক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিজস্ব চিন্তাশৈলী ও মননকে তিনি এ ছবিতে কেন্দ্রীভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শিষ্যদের মুখের বিচিত্র অনুভূতি চিত্রন ছিল প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। সন্দেহ, ভয়, বিষাদ বেদনা, জিজ্ঞাসা উদ্বেগ এতো বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছিল হয়তো বাস্তবেও করে দেখানো সম্ভব ছিল না। অথচ ছবিতে কোন অতিশোয়াক্তির সুযোগ ছিল না। মানবজাতির শিল্প প্রতিভা কতখানি থাকতে পারে এ ছবিটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরন। সবশেষে তিনি আঁকলেন যীশুর ভাবলেশহীন  মুখ। যে মুখে ভয় নেই, উদ্বেগ নেই, ঘৃনা নেই। তিনি তো জানতেন তাকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে। লিওনার্দো তার ছবিতে অনুভূতিহীন এক স্বর্গীয় ভাব ফুটিয়ে তুলেছেন জীবন্তভাবে যীশুর মুখে।
১৪৯৯ সালে ফরাসী সম্রাটের আক্রমনে মিলান ফরাসীদের অধীনে চলে যাওয়ায় ইচ্ছা থাকলেও মিলানে থাকা হলোনা লিওনার্দোর। এরপর পরই ফ্লোরেন্সে। তখনি তার তুলিতে স্থান পায় মোনালিসা। অসংখ্য ছবিসহ তার মৃত্যূর পর প্রায় পাঁচ হাজার পৃষ্ঠার একটি পান্ডুলিপিতে তিনি তার জীবনের সকল পর্যবেক্ষন লিপিবদ্ধ করে যান। এটি তিনি লিখে যান উল্টোভাবে যা আয়নার সামনে নিয়ে পড়া যেত। এতে তিনি লিপিবদ্ধ করে যান চীনের প্রাচীন উপকথা, সমুদ্রস্রোতের প্রকৃত কারন, বাতাসের চাপ, গতি, পৃথিবীর ওজন, মধ্যযুগীয় দর্শন, নিশাচর পাখির গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি। এছাড়াও লিখেছেন সূর্যের দূরত্ব, উড়ন্ত যান, সাতার কাটার যন্ত্র, আলো প্রকৃতি, যুদ্ধাস্ত্রের নকশা, সুগন্ধ সেন্ট তৈরির ফর্মুলা, পাখি-জন্তু-জানোয়ারদের আচার আচরন, গানিতিক বিভিন্ন সূত্র। তার বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাছিল অনেকটা গোপনে। তিনি বেশ কয়েকটি মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছিলেন দেহ ও দেহকোষের গঠনপ্রনালী। এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শরীর তত্বের ওপর সাড়া জাগানো কিছু ছবিও তিনি একেছিলেন। সে ছবিগুলো তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এতোই নির্ভূল ছিল যে পরবর্তীকালের চিকিৎসকরা তা পর্যবেক্ষন ও নিরীক্ষন করে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছিলেন। লিওনার্দোর মৃত্যূর প্রায় আড়ইশো বছর পর (সপ্তদশ শতাব্দির শেষদিকে) একজন পন্ডিত ও গবেষক তার পান্ডুলিপির পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হন। এবং তা চৌদ্দটি খন্ডে প্রকাশ করেন। পন্ডুুলিপির এক জায়গায় তিনি লিখে যান মানুষ একদিন আকাশে উড়বেই। তিনিই প্রথম উড়োজাহাজের নাকশা আঁকেন। পরবর্তীকালে তিনি ফ্লোরেন্সে ছেড়ে আবার মিলানে চলে গেলেও মাঝে মাঝে ফ্লোরেন্সে আসতেন। ১৫১৬ সালে ফরাসী সম্রাটের আক্রমনে তিনি প্যারিস চলে যান। বৃদ্ধ বয়সে তিনি ঈশ্বরের অনুরক্ত  হয়ে পড়েন। ডানহাত বন্ধ হয়ে গেলেও বাঁ হাতে তিনি ছবি আঁকার কাজ চালিয়ে যেতেন। ৬৭ বছর বয়সে ১৫১৯ সালে ইতালীর রেনেসাঁর সেরা পুরুষ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় গ্রহন করেন। তাঁর মৃত্যূতে এক বিশাল নক্ষত্রের পতন হয়। দ্যা লাষ্ট সাপার, ভার্জিন ও মোনালিসার এই অমরস্রষ্টা চিত্রশিল্পের জগতে আজো রয়েছেন অম্লান এবং অক্ষয়।

Facebook Comments

Leave a Reply