ছিটমহল যুগের অবসান

মন্তব্য প্রতিবেদন 
মুহম্মদ আলতাফ হোসেন : বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় শুরু হয়েছে। এইক্ষণটি বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন বলে বিবেচিত হবে। দুই দেশ ছিটমহলের মতো একটি জটিল বিষয় সমাধান করেছে। ছিটমহল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য অধিকার সুরক্ষিত হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত ৬ ও ৭ জুন ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে যে সীমান্ত চুক্তি বিল বিনিময় হয় সে অনুযায়ী ভারতের ১১১টি ও বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের ছিটমহলবাসীর প্রায় ৬৮ বছরের দুঃখ-যন্ত্রণার অবসান হচ্ছে। ছিটমহলে বসবাসকারী নাগরিকরা তাদের অবরুদ্ধ জীবন থেকে মুক্তি পেতে চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল রয়েছে, এতে রয়েছে ৩৭ হাজার মানুষের বাস করেন। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা ১৪ হাজার। ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের আয়তন মোট ৭ হাজার ১১০ একর; অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর। এই চুক্তি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (৭১১০ একর জমি) ভারতের অংশ হয়ে যাবে। আর ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭,১৬০ একর জমি) বাংলাদেশের অংশে আসছে। ছিটমহলগুলো বিনিময়ের পর এসব স্থানের অধিবাসীরা স্ব-স্ব দেশের নাগরিকত্বসহ ভোটাধিকারের পাশাপাশি সব ধরনের নাগরিক সুবিধা ভোগ করবেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর ও কোচবিহারের সীমানা নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় ছিটমহলের উদ্ভব হয়। সমস্যা সমাধানে ১৯৫৮ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। যেটা নেহরু-নুন চুক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে এই চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এরপর ১৯৭৪ সালে ছিটমহল বিনিময়, অমীমাংসিত সীমান্ত ও অপদখলীয় জমি নিয়ে সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যেটা মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নামে পরিচিত। তখন এই চুক্তি বাংলাদেশের পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলেও ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়ায় দেশটির পার্লামেন্টে চুক্তিটি অনুমোদন করা হয়নি। ফলে এই চুক্তি বাস্তবায়নও আটকা পড়ে যায়। এরপর ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল স্বাক্ষর করা হয়। তবে সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছর ভারতের লোকসভায় সীমান্ত চুক্তি বিল পাসের পর এই চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। এরপর গত ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি বিল বিনিময় হয়। সেই চুক্তি বাস্তবায়নে একটি রূপরেখাও চূড়ান্ত করা হয়। সে অনুযায়ী সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে আলোর মুখ দেখছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতি হতে যাচ্ছে বলে আমরা মনে করি। তবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে আরো বেশকিছু বিষয় রয়েছে, সে ব্যাপারেও ভারতের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে ছিটমহল বিনিময়ের মতো বাকি সমস্যাগুলো সমাধানে ভারত উদ্যোগ নেবে। আমরা চাই ভারত-বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর ব্যাপারে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসুক।

লেখক – সাংবাদিক, কলামিস্ট

Facebook Comments

Leave a Reply