আমস্টারডাম ।। মুহম্মদ জাফর ইকবাল : পর্ব ১

১.
আমস্টারডাম শহরে প্রথম দিন ভোরবেলা বের হয়েছি, আমাদের সাথে আমার ছেলে। ঝলমলে একটা শহরে হাসিখুশি সুখী মানুষের ভিড়। তার মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আমার ছেলে আমাকে খুব মূল্যবান একটা তথ্য দিল; বলল: “যখন কফি খাবার ইচ্ছে করবে, খবরদার কফি শপে ঢুকবে না।”
আমি এবং আমার স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম: ‘‘কেন?”
আমার ছেলে বলল: ‘‘কারণ কফি শপ হচ্ছে গাঁজা খাওয়ার দোকান। কফি খেতে হলে যাবে ক্যাফেতে।”
আমার ছেলে তার পুরনো মডেলের বাবা মাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে কী না সেটা সাথে সাথেই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ হল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় একটু পরে পরেই কফি শপ; সেখানে কেউ কফি খাচ্ছে না। ঢুলু ঢুলু চোখে গাঁজা টানছে। অতি বিচিত্র একটি দৃশ্য।
আমস্টারডামে অবশ্যি এটি মোটেও বিচিত্র নয়, এখানে গাঁজা খাওয়া আইনসম্মত ব্যাপার। যারাই দেশ বিদেশ, বিশেষ করে ইউরোপের খোঁজখবর রাখেন তারা সবাই জানেন, হল্যান্ডে টিউলিপ ফুলের ছড়াছড়ি। ইউরোপের বড় বড় শিল্পীরা প্রায় সবাই উইন্ড মিলের সামনে বিশাল বিশাল টিউলিপ বাগানের ছবি এঁকেছেন। কাজেই আমস্টারডামে ফুলের বিশাল নার্সারি থাকবে সেটি মোটেও অবাক হবার কিছু নয়। কিন্তু সেই অপূর্ব নার্সারির অসংখ্য ফুলের গাছ, গাছের চারা, ফুলের বীজের মাঝে বড় একটা জায়গা দখল করে আছে গাঁজার গাছ। সেখানে নানা ধরনের গাঁজার চারা বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষজন আগ্রহ নিয়ে সেগুলো কিনছে।
আমস্টারডামের মতো এত সুন্দর একটা শহরের বর্ণনা দেবার সময় প্রথমেই গাঁজার গল্প দিয়ে শুরু করা মনে হয় ঠিক হল না। কিন্তু কেউ যেন মনে না করে যে, এই পুরো শহরটিতে অসংখ্য গাঁজাখোর মানুষ সারাক্ষন ঢুলু ঢুলু লাল চোখে বিড় বিড় করে কথা বলতে ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করছে। এটি খুবই আনন্দমুখর নিরাপদ একটি শহর। আমি এবং আমার স্ত্রী আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে সিনেমা দেখে গভীর রাতে নিশাচর শিল্পীর সুমধুর ট্রাম্পেট শুনতে শুনতে বাসায় ফিরে এসেছি। একবারও মনে হয়নি পথেঘাটে কোথাও নিরাপত্তার কোনো অভাব আছে।
আমস্টারডামে শুধু যে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি হয় তা নয়, আরও নানা ধরনের নেশার জিনিসপত্র খোলা দোকানে কেনা যায়। খরিদ্দার অবশ্যি বেশিরভাগই পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা ট্যুরিস্ট। আমস্টারডামের দেখাদেখি আমেরিকার অনেক শহরেও আজকাল গাঁজা বিক্রি আইনসিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি যে শহরে আমার পিএইচডি করেছি সেই সিয়াটল শহরটি এ রকম একটি শহর।
তবে আমি একটি হিসাব মিলাতে পারি না। এখন আমেরিকার নানা শহরে এই মাদকগুলো আইনসিদ্ধভাবে কেনা যায়, কিন্তু আজ থেকে বিশ পঁচিশ বছর আগে এগুলোসহ কাউকে ধরা হলে তাকে সারাজীবনের জন্যে জেলে বন্দি করে রাখা হত। নিশ্চয়ই এ রকম অসংখ্য মানুষ এখনও জেলে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। রোনাল্ড রিগানের আমলে মাদকমুক্ত সমাজ তৈরি করার নামে বেছে বেছে কালো মানুষদের এই আইনগুলোর আওতায় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যারা পৃথিবীর খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনও কী অবলীলায় পথেঘাটে কালো মানুষদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়।
<<চলবে>>
Facebook Comments