ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক সুনসান

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক : বিকেল হলেই দেখা মেলে শিক্ষার্থীদের। চলে আড্ডা, গান। কেউবা আবার প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা প্রিয়জন নিয়ে খুনসুটিতে মেতে ওঠেন। ঝুলন্ত সেতু, বাঁশের সাঁকো, ওয়াচ টাওয়ার, ছাউনিবেষ্টিত সারি সারি বসার স্থান, পাশে বোটানিকাল গার্ডেন। লেকের দুই পাশে বাহারি রঙের ফুল, ফলের গাছ। লেকে ফুটে থাকা পদ্মফুল কিংবা হরেক রঙের মাছগুলোর জলকেলি খেলা। শীতকালে অতিথি পাখিদের আগমন কিংবা দেশি পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ।

সবমিলিয়ে এক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। সেই নান্দনিক লেকটির নাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় লেক বা সংক্ষেপে ‘ইবি লেক’। তবে লোকেমুখে এটি সবার কাছেই পরিচিত ‘মফিজ লেক’ নামে। আবার কেউ কেউ রসিকতার স্বরে বলে ফেলেন ‘গরিবের হাতিরঝিল’।

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) একবারে পশ্চিমে তাকালে দেখা মেলে নয়নাভিরাম মফিজ লেকের। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন প্রকৌশলী ভবন ঘেঁষে লেকটি অবস্থিত। এই লেকের দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০ মিটার। মূল লেকটির আকার ইংরেজি ‘ওয়াই’ আকৃতির মতো, তবে মূল লেক ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী ভবনের পেছনে রয়েছে বিস্তৃত লেক।

লেকটির ইতিহাস অনেক পুরাতন। ১৯৭৯ সালের পূর্ব থেকেই এই স্থান দিয়ে লেকটি প্রবাহিত হওয়ার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে সেই সময়ে এই লেকটির নামকরণ করা হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় লেক’। কিন্তু এই লেকের নাম ‘মফিজ লেক’ হওয়ার পেছনে লোকমুখে কিছু কল্পকাহিনি শোনা যায়।

জনশ্রুতি রয়েছে, মফিজ নামের এক অজ্ঞাত পাগল প্রেমিক তার প্রিয়তমার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে অথবা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এই লেকে আত্মহুতি দিয়েছিলেন। এরপর থেকে ক্রমান্বয়ে এই লেকটি ‘মফিজ লেক’ হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। আবার কেউ কেউ বলেন, যারা অযথা প্রেম করে সময় নষ্ট করতেন, তারা এখানে এসে গল্প করতেন। তাদেরকে ব্যঙ্গ করে ‘মফিজ’ বলে ডাকতে ডাকতে এই জায়গাটি ‘মফিজ লেক’ বলে পরিচিতি পায়।

সম্প্রতি আকিজ গ্রুপের অর্থায়নে ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে লেকটির ওপরে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি ব্রিজ। লেকের উত্তর-পশ্চিম পাশে নির্মাণ করা হয়েছে সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার এবং পূর্ব পাশে বোটানিক্যাল গার্ডেন। কিছুদূর অন্তর অন্তর দর্শনার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বসার স্থান তৈরি করা হয়েছে। লেকটিতে বিভিন্ন ধরনের ফুল ফোটে থাকে। এর মধ্যে লাল পদ্ম, কচুরি ফুল ও সাদা কাশফুল অন্যতম।

সারা দেশের অতিথি পাখির আগমনের স্থানের মধ্যে ইবি লেকও বেশ পরিচিত। এই লেকে শুভ্র বক, বুনো শালিকের দল, টিয়া, ময়না, ফিঙে, মাছরাঙা, সরালি, ল্যাঞ্জা হাঁস, খুঁনতে হাঁস, বালি হাঁস, মানিকজোঁড়া প্রভৃতি পাখির আগমন লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, অনেক আগে থেকেই এই লেকে সাইবেরিয়া, উত্তর মেরু, ভারত, নেপাল প্রভৃতি দেশ থেকে অতিথি পাখির আগমন ঘটে। লেকটিকে অতিথি পাখিদের জন্য ‘অভয়ারণ্য’ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তবে দীর্ঘসময় ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় এখানে আগের মতো শিক্ষার্থীদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায় না। প্রেমিক-প্রেমিকাদের খুনসুটিও চোখে পড়ে না। বসে না আড্ডা, গানের আসর কিংবা চড়ুইভাতি।

দৃষ্টিনন্দন লেকটি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত হাতছানি দিয়ে যেন ডেকেই যাচ্ছে! তবে শিক্ষার্থীরা না থাকলেও এখানে বিকেল হলেই বখাটে ছেলেদের আড্ডা বসে। ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখানে তাদের মাদক সেবন করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

লেকটির চেহারাও যেন ‘রোগাক্রান্ত’ হয়ে উঠেছে। কচুরিপানায় প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে লেকটি। আগের মতো নেই স্বচ্ছ পানির ঢেউ। পানি অপরিষ্কার থাকায় লেকের বিভিন্ন রঙের মাছের লেজ নাড়িয়ে ঘোরাফেরার দৃশ্যটিও চোখে পড়ে না আর। অনেক মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা গেছে।

লেকটি অপরিষ্কার থাকায় ও আশপাশ ঝোঁপঝাড়ে পূর্ণ হওয়ায় দিন দিন মশা ও বিষাক্ত সাপের উপদ্রব বাড়ছে। সবমিলিয়ে কর্তৃপক্ষের অযত্ন-অবহেলায় অনেকটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রূপ নিয়েছে দৃষ্টিনন্দন ইবি লেক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মুন্সি শহীদ উদ্দীন মোহাম্মাদ তারেক বলেন, ‘এই মাসের শেষের দিকে লেক খনন করতে টেন্ডার আহ্বান করা হতে পারে। লেক খননকালে কচুরিপানা ও ঝোঁপঝাড়ও পরিষ্কার করা হবে।’

Facebook Comments