সবার জন্য ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হবে না : চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনের শীর্ষ মেডিক্যাল কর্মকর্তা গ্যাও ফু বলেছেন, চীনে প্রত্যেকের জন্য কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের প্রয়োজন হবে না। এর পরিবর্তে করোনা মহামারিতে যারা সম্মুখসারিতে থেকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এবং উচ্চ-ঝুঁকিতে আছেন; ভ্যাকসিন দেয়ার ক্ষেত্রে তারাই অগ্রাধিকার পাবেন।

দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা চায়না নিউজ সার্ভিস বলছে, শনিবার শেনঝেন শহরে আয়োজিত ভ্যাকসিন সামিটে এসব কথা বলেছেন তিনি।

চীনা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালক গ্যাও ফু বলেছেন, উহানে কোভিড-১৯ এর প্রথম ঢেউ দেখা দেয়ার পর চীন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার এর প্রভাব কাটিয়ে উঠেছে।

ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে ঝুঁকি এবং সুবিধা বিবেচনা করে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে গণহারে ভ্যাকসিন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে আরেকটি গুরুতর প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানান তিনি।

চীনের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশের সরকারের পুরো বিপরীত। অস্ট্রেলিয়া সরকার দেশটিতে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গণহারে প্রয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বসন্তের শুরু থেকে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের গতি নিম্ন রয়েছে। তবে গত মে মাসে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলের জিলিন প্রদেশে করোনার ক্লাস্টার শনাক্ত হয়। এছাড়া রাজধানী বেইজিংয়ে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় জুনে।

পরবর্তী মাসে জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমকিতে আরকেটি প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। কিন্তু গণহারে পরীক্ষা এবং তাৎক্ষণিক লকডাউন কার্যকরের কারণে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

গ্যাও ফু বলেছেন, সম্ভাব্য যেকোনও ভ্যাকসিন কার্যকর প্রমাণিত হলে সম্মুখসারিতে থাকা কর্মীরা তা অগ্রাধিকারভিত্তিতে পাবেন। মেডিক্যাল কর্মী, বিদেশে ভাইরাসের হটস্পটে কর্মরত চীনা নাগরিক এবং ঘনবসতিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট, স্কুল ও পরিষ্কার সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বলেছে, শনিবার দেশটিতে ১০ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে; যাদের সবাই বিদেশ ফেরত। এছাড়া অ্যাসিম্পটোমেটিক হিসেবে বিদেশফেরত আরও ৭০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

বিশ্বে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতায় এখনও নেতৃত্বের আসনে রয়েছে চীন। বিশ্বে ভ্যাকসিনের সর্ববৃহৎ উৎপাদনকারী এবং গ্রাহক এই দেশটি বছরে এক বিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারে। চীনে ভ্যাকসিনের ৪০টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৩০টিরও বেশি ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষায় রয়েছে, যার ৯টিই চীনের; এই সংখ্যা বিশ্বের একক কোনও দেশের সর্বোচ্চ। বেইজিংয়ের চারটি ভ্যাকসিন শেষ ধাপের ট্রায়ালে পৌঁছেছে। এর যেকোনও একটি ভ্যাকসিন নিরাপদ এবং কার্যকর প্রমাণিত হলে তা বিশ্বের কাছে সরবরাহ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

চীনের মূল ভূখণ্ডের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করোনাভাইরাসের নাকে স্প্রে ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমোদনের ঘোষণা দিয়েছে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়।

চীন ইতোমধ্যে কিছু ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল আসার আগেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রয়োগ শুরু করেছে। গত জুনের শেষের দিকে দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মাঝে একটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়।

এছাড়া জুলাই থেকে উচ্চ-ঝূঁকিতে থাকা দেশটির মেডিক্যাল কর্মী এবং সীমান্তরক্ষীদের জন্য আরেকটি ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমতি দেয়া হয়। এসব ভ্যাকসিনের কোনোটিই তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা এখনও শেষ করতে পারেনি।

বিশ্বের অন্যান্য দেশও চীনের পথে হাঁটতে পারে। রোববার ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের জরুরি ব্যবহারের অনুমোদনের বিষয়ে বিবেচনা করছে ভারত সরকার।

গত জুলাই মাসে করোনাভাইরাসের পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিন নিজের শরীরে প্রয়োগ করেছেন চীনা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) পরিচালক গ্যাও ফু। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস বলছে, জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গ্যাও ফু ভ্যাকসিন নিয়েছেন।

গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়। এর পর ভাইরাসটি বিশ্বের দুই শতাধিক দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দুই কোটি ৯২ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত ও ৯ লাখ ২৯ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

মহামারির তাণ্ডব অব্যাহত থাকলেও রাশিয়া ছাড়া কোনও দেশই এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আনতে পারেনি।

Facebook Comments