অভিমানী ছাতা-মোঃ শফিউল ইসলাম চৌধুরী (সাবিদ)

টিউশন থেকে ফিরছিলাম,হেঁটে আসা যায় তাই আনমনে হাটতে লাগলাম।টিউশন থেকে বের হওয়ার সময় ও কড়া রোদের প্রভাব ছিলো।কিন্তু কে জানতো সে অভিমান করে কিছুক্ষন এর মধ্যে ভে করে কেঁদে দিবে।

বাসার কাছাকাছি আসতেই মেঘের কান্না শুরু,মূহুর্তের মধ্যে ভে করে কান্না শুরু করে বৃষ্টির গতিবেগ বাড়িয়ে দিলো।মানে নিমিষেই ঝুম বৃষ্টি।এক মূহুর্তের মধ্যে কাওয়া ভেজা হয়ে গেলাম।বাসায় গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে কলিং বেল টিপলাম।আম্মা দরজা খুলছে।

এরকম কাওয়া ভেজা দেখি আম্মা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে ছিলো কিছুক্ষন।তাকানো দেখে রাগ লাগতেছিলো,কোথায় তার ছেলে ভেজা কাওয়া হয়ে আসছে,গামছা বা কিছু একটা দিবে তা না করি তাকাই আছে।

–এখন কি হা করি তাকাই থাকবা নাকি গামছা বা কিছু একটা দিবা।
–একবারে ভালা অইয়্যি।ভিজ্জো দে গম লার না।
–হ তুমি তো খুশি।
–তো এইবার ছাতির মর্ম বুঝো।

আমার একটা বদ অভ্যাস আছে।আমি প্রতিনিয়ত ছাতি হারায়।যেখানে যাই না কেন সেখানে আপন মনে ভুলে চলে আসি।এই পর্যন্ত কয়েক টা হারায়ছি।এরপর ছাতির কথা বললেই আম্মা চিল্লাই,অভ্যাস টা পেয়েছি আব্বু থেকে।আব্বু ও প্রায় সময় ছাতি ফেলে আসে।তবে তার আর আমার মধ্যে পার্থক্য হলো তিনি কিভাবে জানি তার হারানো ছাতি ফেরত পায় বাট আমি পায় না।

বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য রেডি হলাম,এমা দেখি মেঘের পেট কামরানি শুরু হয়ছে,মুখ খানি বেশ কালো।এই বুঝি কেঁদে দিলো!আম্মুরে বলি,

–দেখো বের হবো বৃষ্টি আসতেছে।
–তো কি করতাম এখন?(আম্মু)
–একটা ছাতি কিনে দাও না।
–জমানো টাকা দিয়ে কিনে নাও তুমি।
–কেন আমার টাকাতে কেন কিনতাম,তুমি দিলে সমস্যা কই?
–আমি অনেক কিনে দিসি,তাই সেগুলোর কদর নাই।নিজের টাকায় কিনলে কোথাও আর ভুলবা না।

ভেবে দেখলাম কথা টা খারাপ বলে নাই,কারণ নিজের জমানো টাকা তে যেটাই কিনি না কেন অনেক যত্নে রাখি।পরক্ষনে আম্মা বলে উঠলো

–এই একবছর এ আপনার হারানো ছাতির রেকর্ড কতো?
–এইতো বেশি না ৫ টা।
–আপনার কাছে এটা বেশি না মনে হয় তাইলে?
–আম্মু বনিতা করো না তো,এইবারের জন্য একটা কিনে দাও না।বাইরে যাইতে পারতেছি না।
–আচ্ছা আপনার ৫ টি ছাতি কোথায় কোথায় হারিয়েছেন?
–এখন কি তুমি এফবিআই এর মতো আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করবা নাকি?
–না ইনভেস্টিগেট করতেছি।
–একটা কোচিং যাইতে রিকশার সিটের পাশে চাপানো অবস্থায়, আরেকটা টং দোকানে,বাকি গুলো মনে নাই।
–বাহ!চায়ের চুমুকে এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন যে ছাতি টা পর্যন্ত আগলে রাখতে পারেন নাই।যে ছেলে সামান্য ছাতি আগলে রাখতে পারে না সে ভবিষ্যতে প্রেমিকা বা বউ আগলে রাখবে কিভাবে?
–আরে রাখো তোমার ফাজলামো।
–কিয়ের ফাইজলামি?
–আচ্ছা শুনো আমাকে বাইরে যাইতেই হবে,আপাতত তোমার ছাতি নিয়া যাইতেছি।
–কোনো দরকার নাই বাপজান,আপনি তখন আমার ছাতিরেও বিসর্জন দিয়া আসবেন কোথাও।
–তো এখন কি এরকম প্যান্ট শার্ট পড়ে রেডি অবস্থায় বসি থাকতাম?
–এইবার লাস্ট কিন্তু,আর হারাইলে রক্ষে পাবা না।
–লাভ ইউ।
–থাক।অইটা আপাতত নতুন ছাতি রে ভালোবাসা মনে করে কইও!

বৃষ্টি থেমেছে।বের হয়েছি,কাজ শেষে ফেরার পথে আম্মু দেয়া টাকাতে ছাতি কিনেছি।নতুন ভালোবাসা।বৃষ্টির দিনে এইটাই একমাত্র আশা ভালোবাসা সব।সব ঠিকঠাক বাসার দিকে আসছি।হঠাৎ বন্ধুর সাথে দেখা,তাও আবার অনেকদিন পর।

–আরে শিহাব কি অবস্থা?(আমি)
–আরে রাফি মাম্মা এনা।এইতো ভালো,তোর কি অবস্থা? (শিহাব)
–আরে কইস না আছি,তো কেমন যায় দিনকাল?
–কথা হবে অনেক,আগে চল কোনো চা নাস্তার দোকানে বসি।
–আচ্ছা চল…

গিয়ে বসলাম এক রেস্তোরাঁ তে।নাস্তা শেষে চায়ের চুমুকে তুমুল আড্ডা।অনেক দিন পর দেখা সো জমানো কথা সব বেয়ে বেয়ে পড়ছে।নতুন ভালোবাসা কে পাশের চেয়েয়ারে সম্মানের সহিত রেখেছি।বেশ কথাবার্তার পর বিল দিয়া নিয়ে শিহাব এর সাথে তর্ক করতে করতে,শেষ মেষ হেরে গেলাম।সে দিলো বিল,কথা বলতে বলতে বাইরে এসে বন্ধ শিহাব কে বিদায় দিয়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম।

বাসার সামনে আসতে না আসতেই আবারো সেই ভে করে কেঁদে দেয়া মেঘের ঝুম বৃষ্টি। আবারো কাওয়া ভেজা।তখন হঠাৎ মনে পড়লো ভালোবাসার কথা,মানে নতুন ছাতি ফেলে আসছি।ছোটখাটো স্টোক করে ফেলছি ভিতরে ভিতরে।রিক্সা নিয়ে আবারো রেস্তোরাঁ টাতে,যেই টেবিলে বসেছি গিয়ে দেখি সেখানে আমার ভালোবাসা নেই।হারিয়ে গেছে,অভিমান করে হয়তো অন্য কারো হাত ধরে চলে গেছে।

মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লাম।আম্মুরে কি জবাব দিবো তা ভাবতেই বুকে কিঞ্চিৎ ব্যাথা অনুভব হলো।আহা আম্মার কথাই সত্যি,ছাতিরে আগলাইয়া রাখতে পারতেছি না সেখানে প্রেম ভালোবাসা আগলামো কিভাবে?বসে থাকতে দেখে ওয়েটার আসি বলে;

–কি খাবেন ভাইয়া?
–কিছু না।
–গরম গরম পরোটা,মোগরাই ডাল,রুটি,চিকেন টিক্কা হবে।সব গরম গরম ভাইয়া,দিবো?
–ভাইয়া ছাতি হবে?
–সরি ভাইয়া?
–আরে ছাতি আছে?
–সরি ভাইয়া এখানে তো ছাতি পাওয়া যাবে না।
–আরে ভাই দেখেন না,ভাঙ্গাছুড়া হলেও হবে।
–না ভাইয়া নাই।
–তাইলে এক গ্লাস পানি আনি আমার মাথায় ঢালেন।

আমার কথা শুনে ওয়েটার ঠিক ঠিক এক গ্লাস পানি এনে দিলেন,কাওয়া ভেজা অবস্থায় মাথার উপরে ঢেলে দিলাম পানি।তাও শান্তি নাই,টেনশন কমছে না ছাতিও মিলছে না!ভে ভে করে কান্না করতে করতে চিল্লাই দিলাম,আম্মা আমি আমার ছাতি আগলাইয়া রাখতে পারলাম না।আমার দিকে সবাই হা হয়ে থাকায় ছিলো,তাও কেউ একটা ছাতি দিয়া শান্তনা দিলো না।আজব দুনিয়া, দয়া নেই দেখছি কারো।

মানুষ কি দয়া দেখাবে,ছাতা ই আমাকে দয়া দেখায় না,অভিমান করে হারায় যায়।

Facebook Comments