মার্চ ৭, ২০২১

Latest News Before Everyone in Bangladesh

নতুন বিড়াল পুষতে যে বিষয় জানা জরুরি

২ min read

সবে মাত্র বয়স দুই কি তিন দিন, এমন অবস্থায় রাস্তায় ধারে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম ওকে। ভয়ে কান্না করে যাচ্ছিল, কোন ‘সহৃদ্বয়বান’ ব্যাক্তি মৃত্যমুখে ফেলে রেখে গিয়েছিলেন হয়তো। এখন সে সারা পাড়া দাপিয়ে বেড়ায়, রাতে খিদে পেলেই শুধু দেখা মিলে। ঘুমায়ও মানুষের মতো!” এমনই ছিল রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বিড়ালের মা ঐশী’র বক্তব্য।

তবে বিড়ালকে আদর যত্ন করে এই দাপাদাপির পর্যায়ে আনতে কম দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি তাকে। পথে পড়ে থাকা, কিংবা এক টুকরো খাবারের অভাবে পই পই করে ঘুরে বেড়ানো বিড়ালকে যারা আদর করে কোলে তুলে নিচ্ছেন, তারা কি পারছেন শেষ রক্ষা করতে? এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি বিশেষ এবং পেট ডক্টরদের সাথে মত বিনিময় করে নতুন করে বিড়াল পুষতে চাইলে যে বিষয় গুলো না জানলেই নয়, সেগুলো তুলে বিশদ বর্ননাসহ তুলে ধরা হয়েছে এই আর্টিকেলে। তবে তার আগে চলুন বিড়ালের মন আর ভাষা বোঝা নিয়ে একটু পড়াশোনা করে আসি।

বিড়ালের মন – বোঝা বড় দায়!

মানুষের সঙ্গে বিড়ালের কিছু দূরত্বের কারণে বিড়ালের ভাষা বুঝতেও আমরা অনেক সময়ই ব্যর্থ হই।

হিয়েস্ট্যান্ড বলেন, “বিড়ালের একগুঁয়ে ও স্বনির্ভর সভাবের কারণে বিড়ালের জনপ্রিয়তা দিনকে দিন বাড়ছেই। তবে বিড়াল এই জীবন-যাপনে অভ্যস্ত কিনা সেটা অন্য বিষয়। মানুষ চায় বিড়ালও যেন কুকুরের মতোই হয়, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে; এরা এরকম না।”

গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের প্রতি বিড়ালের আচরণ একটু জটিল।

“এটি খুবই পরিবর্তনশীল ও জিনগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিচালিত। একটি বিড়ালের বাচ্চা জন্মের পর প্রথম ছয় থেকে আট সপ্তাহ কী ধরণের অভিজ্ঞতা পেয়েছে তার উপর নির্ভর করে বিড়ালটি কতটা সামাজিক হবে। যদি জীবনের শুরুর এই সময়টিতে তারা মানুষের কাছ থেকে ভাল ব্যবহার পায়, তাহলে দেখা যায় পরবর্তী জীবনে এরা সাধারণত মানুষকে পছন্দ করে,” যোগ করেন হিয়েস্ট্যান্ড।

তবে এরপরও সার্বিকভাবে বিড়ালের আচরণ একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। যেমন বেওয়ারিশ বা রাস্তায় থাকা বিড়াল সাধারণত মানুষকে দেখলে পালিয়ে যায়। এই স্বভাবটি তারা পেয়েছে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। আবার দেখা যায় গৃহপালিত কোনো বিড়ালও বাসার মানুষের সঙ্গে দূরত্ব রেখে চলছে, কোনো বিড়াল আবার মানুষের সঙ্গ খুবই পছন্দ করছে।

ম্যাও ভাষা বুঝবো কীভাবে?

কুকুরের মতো বিড়ালও মানুষের সঙ্গে অনেক ধরনের যোগাযোগ করে, তবে সেটা শব্দ ব্যবহার না করে শুধুমাত্র শরীরী ভাষার মাধ্যমে। বিড়ালের আচরণ নিয়ে পিএইচডি করা গবেষক ক্রিস্টিন ভিটালে বলেন, “মানুষের পক্ষে কুকুরের তুলনায় বিড়ালের শরীরী ভাষা বোঝা অনেক কঠিন।”

কুকুর কৃত্রিম বিবর্তনের ফসল। কুকুরের পুরো বিবর্তনটাই হয়েছে মানুষের সঙ্গে থেকে। এই বিবর্তনে কুকুরের মধ্যে কিছু এসেছে বৈশিষ্ট্য যেটি বিড়ালের মধ্যে আসেনি। এর মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবর্তন হলো ভ্রু ও চোখের ভাষা। মানুষের দয়া পেতে কুকুর এদের চোখের পাশের পেশী ব্যবহার করে চোখকে করুণ করে তুলতে পারে যেটি “পাপি ডগ আইয” নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে মালিকের প্রতি কুকুকের ভালোবাসা প্রকাশ হয়। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে বিড়ালে চোখে এই বিবর্তনটি হয়নি। ফলে এরা চোখের ভাষা দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না। তবে অন্যভাবেও আপনি আপনার বিড়ালের চোখের ভাষা পড়তে পারবেন। সেটি হলো, ধীরভাবে চোখের পাতার পলক দেওয়া। এটি যদি আপনার বিড়াল করে থাকে তাহলে বুঝবেন সে আপনার প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করছে।

কিছু কিছু বিড়াল বাসায় মালিক ঢোকা মাত্রই তার কাছে আসে। এটি কুকুরও করে থাকে তবে সেটা তাদের শরীরী ভাষায় অনেক বেশি প্রকাশ্য হয়। আপনার বিড়াল এরকম করে থাকলে আপনারও খুশি হবার কথা। কারণ এর মাধ্যমে সে বোঝাচ্ছে আপনার কাছে সে নিরাপদ বোধ করছে। এটি আপনার সাথে বিড়ালের ভালো সখ্যতারই নিদর্শন।

বিড়ালেরও যে আবেগ অনুভুতি আছে, এ বিষয়ে একটি গল্প শোনা যেতে পারে; যা পারতপক্ষে বিড়ালের ভাষাবোধের বিষয়ে আপনাকে আরো বিশ্বাসী আর সচেতন করে তুলতে পারে।

দ্য মোস্ট ইমোশনাল বিলাই – ইশরাতুল শোভা

ইশরাতুল শোভা, যার অল্প ক’দিন হল, বিয়ে হয়েছে। বাসায় তার ছোট-বড় মিলিয়ে গুনে গুনে ৮টা বিড়াল। এরা সবাই খায়-দায়, যেখানে সেখানে ঘুমায় আর খেলে। কিন্তু এদের মধ্যে একটা বিড়াল, নাম লালটু; সে খাওয়া-দাওয়া করে ইশরাতের কোলে বা বুকের উপর এসে না বসলে ঘুমাতে পারে না।

“আমি একটু আধটু ঘুরা-ঘুরি করে থাকি। তো যখনি ৩/৪ দিনের জন্য কোথাও ঘুরতে যেতাম লালটু এই চারদিন অস্থির হয়ে সারা বাসা আমাকে খুঁজে বেড়াতো আর রাতে ঘুমাতো না! এমনকি খাওয়ার পরিমানও কমিয়ে দিতো,না পারতে খাওয়া যাকে বলে! এই সময়টায় মেজাজ খারাপ করে সে ঘরের কোনো এক কোনায় গিয়ে বসে বসে ঝিমাতো! আমি বাসায় ফিরলেই আবার সব ঠিক৷” শোভা জানালেন।

ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে যখন শোভার বিয়ে ঠিক হয়। তার সাথে এতো ঘেষে থাকা বিড়ালটা হঠাৎ শোভার বিয়ের ডেট ঠিক হওয়ার পর থেকেই তার সাথে একটা দুরত্ব তৈরি করে ফেললো। একটা চেয়ারে সারাক্ষন বসে থাকতো মন খারাপ করে৷ সে ডাকলেও কাছে আসতো না৷ এটা নিয়ে ভীষণ খারাপ লাগা শুরু হল শোভার।  তার মনে ভীষন কৌতুহল, ওরা কি এতোটাই বোঝে, এতটাই অনুভব করতে পারে!
১০ জুন, বিয়ের দিন সকাল থেকেও সেই একই ব্যবহার তার, কাছে আসে না। শোভা এক প্রকার জোর করে কোলে নিয়েই ছবি তুললো দুইটা।

“অবাক করা বিষয় হল সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন বিদায় হবে আমার ঠিক তখনই লালটু আমার পায়ের কাছে এসে ঘেষতে লাগলো আর কি যেন বলতে লাগলো। বাসার সবাই এই ঘটনা দেখে কান্না! লিফট পর্যন্ত এসে লালটু আমাকে বিদায় দিলো, আসার আগে কোলে নিয়ে আদর করে এসেছি,একদম চুপ ছিলো তখন,কোনো হাত-পা ছোড়াছুড়ি নেই। আমার জন্য ওই সময়টা প্রচন্ড কষ্টের, একটা ঘোরের মতো ছিলো।” আবেগতাড়িত কন্ঠে বললেন ইশরাতুল।

সুতরাং ক্ষেত্র বিশেষে বিড়ালের এমন গভীর আবেগ দেখার পর তার ভাষা বোঝার চেষ্টা করতেই পারেন। আপনার বিড়াল কি আপনার সঙ্গে তার শরীর ঘষে? অনেক বিড়ালই কিন্তু এটি করে থাকে। এটি মূলত তাদের বুনো বৈশিষ্ট্যের একটি অংশ। বুনো বিড়াল অন্য বিড়ালের সাথে শরীর ঘষে। এর মাধ্যমে এরা অন্য বিড়ালের গন্ধ নিজের শরীরে নেয় আর নিজের গন্ধও অন্য বিড়ালের শরীরে দেয়। তবে একটি বিড়াল সব বিড়ালের সাথে এ কাজটি করে না। শুধুমাত্র যাদেরকে কাছের মনে করে তাদের সাথেই এটি করে। মানুষের সাথেও যখন বিড়াল এরকম করে এর মানে হচ্ছে তাকে বিড়ালটি বন্ধু ভাবছে।

সর্বোপরি, সন্তুষ্ট ও শান্ত বিড়াল বেশি বন্ধুভাবাপন্ন হয়।

“যখন এরা দেখে এদের পানি, খাবার, ঘুমানোর জায়গা ও লিটার ট্রে ঠিকঠাকমতো আছে, যখন এরা নিজেরা ঠিকঠাকমত থাকে, তারপরই কেবল অন্যান্য সামাজিক বন্ধনের ব্যাপারগুলো প্রকাশ করতে এরা সক্ষম হয়।”

তাই এরপরের বার যখন আপনি বাসায় আসবেন, যদি আপানার বিড়ালটিকে চঞ্চল না দেখে শান্তভাবে আপনাকে পর্যবেক্ষণ করতে দেখেন, হতাশ হবেন না। এর মানে হচ্ছে সে বোঝাচ্ছে, আপনাকে বাসায় ফিরতে দেখে সে ভাল বোধ করছে এবং আপনার প্রতি সে সন্তুষ্ট।

নতুন বিড়াল পুষতে যে বিষয় জানা জরুরি

কুড়িয়ে আনা বিড়ালটি যদি ১ মাসের বাচ্চা হয়-

রাস্তা থেকে যদি বিড়াল কুড়িয়ে আনেন তাহলে প্রথমেই শাবকটিকে ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যান কোনও পশু চিকিৎসকের কাছে। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী দিতে হবে কৃমির ওষুধ। সদ্যোজাত শিশুকে যা খাওয়াতে হয়, তাই খাওয়াতে পারেন শাবকটিকে। প্রথম মাসে দিতে পারেন যে কোনও শিশুখাদ্য। দেড় মাস বয়স হলে ভাত আর মাছ সেদ্ধ করে দিন। এখন বাজারে নানা প্যাকেটজাত খাবারও পাওয়া যায়। পেস্ট আর শুকনো- এই দু’রকম খাবারই শাবকটিকে দিতে পারেন। দিনে তিন-চারবার খেতে দিতে হবে।

বাচ্চাটি যদি হয় দেড় থেকে ২ মাস বয়সের-

দেড় থেকে দু’মাস বয়স হলে শাবকটিকে আবার কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে। আর এর এক সপ্তাহের মধ্যে অবশ্যই শাবকটিকে ট্রাইক্যাট ও রেবিস-এই দুই টিকা দিতে হবে। তিন মাস পর আবার ওই টিকা দিতে হবে।

মলমূত্র ত্যাগের জন্য যে ব্যবস্থা নিবেন-

বিড়ালরা মলমূত্র ত্যাগ করে মাটি বা বালি চাপা দেয়। যদি আপনি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা হন, তাহলে পোষ্যর জন্য অবশ্যই কিনতে হবে মল-মূত্র ত্যাগ করার পাত্র বা স্যান্ড বেড। এই জাতীয় পাত্রে বালি দেওয়া থাকে। এতে বিড়ালদের সুবিধা হবে। এমন পাত্র মিলবে পোষ্য কেনা বেচার যে কোনও দোকানে। আর আপনার বাড়ির সামনে যদি বাগান বা মাঠ থাকে, তাহলে তো সমস্যাই নেই। মলত্যাগের জন্য পোষ্যকে সেখানে ছেড়ে দিলেই হবে।

হজমের জন্য নিয়ম করে ঘাস খাওয়ান-

বিড়াল খাবার হজম করতে ঘাস খায়। আবার গা চুলকোলেও ঘাসেই গড়াগড়ি খায়। বাড়ির সামনে ঘাস থাকলে তো ভাল। যদি না থাকে বাজার থেকে কিনে আনুন ঘাস। সেটাকেই বিছিয়ে রাখুন। বিড়াল গা চুলকোলে লোমের বল তৈরি হয়। সেটা পোষ্যর পেটে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে সে। ওই ঘাস খেয়ে বমি করেই নিজেকে সুস্থ রাখে বিড়াল।

বিড়াল বাহিত রোগব্যাধি-

বিড়াল ডিপথিরিয়া রোগের বাহক। বিড়ালকে টিকা দিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। বাড়িতে গর্ভবতী নারী থাকলে বিড়ালের সঙ্গে তার না শোয়াই শ্রেয়। কারণ, অনেক সময় বিড়াল থেকে তিনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এক্ষেত্রে একটু সাবধানতা প্রয়োজন।

বিড়াল আনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনার বিড়ালে এলার্জি (cat allergy) আছে কিনা।

খেলাধুলার ব্যবস্থা করে দিন-

বিড়াল খেলতে অনেক ভালবাসে। তাকে পর্যাপ্ত খেলনা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

বিড়ালের একাকীত্ব-

নতুন স্থানে এসে বিড়ালের সেই পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগে। রাতে জেগে থাকা, না খেয়ে থাকা, না ঘুমানো, কান্নাকাটি করা, বাইরে চলে যেতে চাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। আবার অনেক বিড়ালের মধ্যে থেকে আসলে সে একাকীত্ব অনুভব করবে। কিন্তু ১০-১৫ দিনের মধ্যে সে নিজেকে নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়। তাই ধৈর্য ধরুন। এই বিড়ালটি কিছুদিনের মধ্যে আপনার প্রকৃত বন্ধু হয়ে উঠবে।

আজ আমি নেই বলে ভুলে গেলে কি? – RIP Babu – Shaoulen Sultana Pouspo

আমরা শখের বশে অনেকেই বিড়াল পুষি। খুব আদুরে স্বভাবের এবং তাড়াতাড়ি পোষ মানে বলে পোষা প্রাণীর মধ্যে বিড়াল আমাদের প্রথম পছন্দ। তাকে অবশ্যই পরিবারের একজন সদস্য ভেবে আদর যত্নে  রাখা উচিৎ। মনে রাখবেন, পোষা বিড়াল ধীরে ধীরে আপনার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে যাবে। ঘরের বিড়ালকে রাস্তায় ছেড়ে দিলে প্রতিকুল পরিবেশে সে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই ভেবে চিন্তে বিড়াল ঘরে আনুন।

Facebook Comments