মধ্যরাতের অপেক্ষা

আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর আগের ঘটনা। রাত ১২ টার দিকে আমার ফোনে হঠাৎ কল আসলো। মোবাইল স্ক্রিণে তাকিয়ে দেখি অপরিচিত নাম্বার। সাধারণত রাত ১২ টার দিকে অপরিচিত নাম্বার থেকে যেসব কল আসে সেসব হয় খুব ইমার্জেন্সি নয়ত ফাইযলামি। ফাইযলামি কল  ২/১ বার বেজেই থেমে যায়। যারা মধ্যরাতে ফাইযলামি করতে কল দেয় তাদের ধৈর্য কম থাকে। তারা ২/১ বারের বেশি এক নাম্বারে চেষ্টা করে না, অন্যনাম্বারে কল দেয়া শুরু করে। আর ইমার্জেন্সি কল হলে সেটা ন্যূনতম তিনবার বাজবেই। আমি স্ক্রিণে অপরিচিত নাম্বার দেখে সেটা তিনবার বাজা পযর্ন্ত অপেক্ষা করতে লাগলাম এবং ৩য় বার বাজার সাথে সাথেই রিসিভ করলাম,
-হ্যালো?
-হ্যালো তুমি কে?
একটা ৪/৫ বছর বয়স্ক মেয়ে বাচ্চার গলা। কিছুটা টেনে টেনে কথা বলছে। শুনতে ভালো লাগে। কিছু কিছু কণ্ঠস্বর আছে শুনলে মন ভালো হয়ে যায়, বাচ্চা মেয়েটার গলার স্বরটা তেমনই, বুকের মধ্যে সুখ অনুভূতি সৃষ্টি করে। আমি বললাম,
-ফোন তো তুমি করেছো। আগে তুমি বলো তুমি কে?
-আমি ইলা। এখন তুমি বল তুমি কে?
-আমি ভূত।
-ওমা ভূত কি ফোনে কথা বলতে পারে?
-হুম পারে। মানুষ যেমন পারে, তেমনি ভূত রাও পারে। মানুষ যখন রাতে ঘুমিয়ে যায় তখন ভূতরা ফোনে কথা বলে। দিনে বলতে পারে না। দিনে ভূতরা গাছের ডালে চড়ে ঘুমায়।
ইলা কথা শুনে খিলখিল করে হাসছে। শুদ্ধতম হাসি। ছোট বাচ্চাদের হাসি হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধতম হাসি। মানুষ যত বড় হতে থাকে তত হাসির বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে থাকে। তখন মানুষ মাঝে মাঝেই জোড় করে কৃত্রিম হাসি হাসে। কৃত্রিম হাসি, হাসির বিশুদ্ধতা নষ্ট করে। ছোট বাচ্চারা কৃত্রিম হাসি হাসতে পারে না, তাই তাদের হাসি হয় শুদ্ধতম হাসি।
-আচ্ছা ভূত, তোমার কোনো নাম নেই?
-না। ভূত সমাজে তো কারো নাম থাকে না।
ইলা খানিকক্ষণ মনে হয় কিছু চিন্তা করলো,
-তোমার নাম আমি দিলাম মোবাইল ভূত। তুমি মোবাইলে কথা বলো তো তাই।
-খুব সুন্দর নাম তো! তোমাকে ধন্যবাদ।
-তোমার পছন্দ হয়েছে?
-হুম ভীষণ।
-আচ্ছা মোবাইল ভূত আমি যাই। তোমাকে কাল আবার ফোন দিবো। তুমি খুব ভালো ভূত। একটুও ভয় দেখাও না। হিহিহি।
বলেই, খুট করে লাইনটা কেটে গেলো। আমি কিছু বলতেও পারলাম না, তার আগেই। আমি কল ব্যাক করার জন্য ফোন দিলাম, বন্ধ দেখালো। পরপর তিনবার একই ঘটনা।
পরেরদিন অনেকবার চেষ্টা করলাম। না, নাম্বার অফ দেখায়। রহস্যজনক ব্যাপার। জগতের অতি রহস্যজনক ব্যাপারের সমাধান হয় পানির মতো সহজ। কিন্তু আমি এ রহস্যের সমাধান করতে পারলাম না। রাত ১২ টার পর আবার সেই নাম্বার থেকে ফোন আসলো।
-হ্যালো, মোবাইল ভূত?
-হ্যা বলো ইলা।
-কেমন আছো?
-ভালো। তুমি কেমন আছো?
-ভালো।
-আচ্ছা আজকে সারাদিন তোমার মোবাইল বন্ধ ছিলো কেনো?
-জানি না।
-বলবে না আমাকে?
-জানিনা।
-আচ্ছা বলার দরকার নেই। কি করো?
-পুতুল নিয়ে খেলি। একটার নাম তুলু, আরেকটার নাম ভুলু।
-বাহ্! বেশ সুন্দর নাম তো! তুমি কি সবাইকেই একটা একটা করে নাম দাও?
-হুম দিই তো। তোমাকেও তো দিয়েছি। মোবাইল ভূত। হিহিহি। আচ্ছা আমি যাই।
এরপরেই হুট করে ফোন রেখে দিলো। এবং যথারীতি ফোন বন্ধ।
এভাবেই ৫/৬ মাস চলে গেলো। প্রতিদিন ২/১ মিনিটের স্বল্প কথাবার্তা। প্রতিদিন রাতে সেই নাম্বার থেকে ফোন আসে কিন্তু আমি ব্যাক করলেই অফ দেখায়। আমি ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম। ভেবে নিলাম এটা প্রকৃতির অদ্ভুত কোনো খেলা। প্রকৃতি অদ্ভুত খেলা খেলতে পছন্দ করে। সে মানুষকে ভড়কে দিয়ে নিজে রহস্যময়ী হতে চায়। আমিও ভড়কে গিয়ে প্রকৃতিকে রহস্যময়ী হতে সাহায্য করলাম।
এই ৫/৬ মাসে ইলা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা গেলো। সে মাছ খেতে পারে না,গন্ধ লাগে। আইস্ক্রিম খেতে ভালো লাগে। যে আইসক্রিম কিনে দেয় তার সাথে সে সারাজীবনের বন্ধুত্ব করে নেয়।  তার অনেক ইচ্ছা সে ডোরেমনের সাথে দেখা করবে। ডোরেমনের জন্য নাকি একটা চিঠিও লিখে ফেলেছে। যেদিন দেখা হবে সেদিন দিবে। আমার সাথে দেখা হলে নাকি আমাকেও দিবে। এসব আরো নানা কথা। প্রতিদিন রাত ১২ টা বাজার পরপরই ফোন আসতো। ২/১ মিনিট কথা হয়ে ফোন কেটে যেতো।
-হ্যালো মোবাইল ভূত?
-হ্যালো। কেমন আছো ইলা?
-ভালো না। আজকে আমার মন খারাপ।
-মন খারাপ কেনো?
-জানি না।
-আমাকে বললে আমি মন ভালো করে দিবো।
-মোবাইল ভূত আমার এখানে ভালো লাগে না। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে প্লিজ?
আমি খানিকটা বিস্মিত হলাম। এতদিন এমন কথা বলে নি। তবে আজ কেন? আমি বিস্ময় চাপা রেখে বললাম,
-তোমার ঠিকানা তো আমি জানি না। আমাকে দাও আমি নিয়ে আসবো।
খানিকক্ষণ চুপ করে বললো, আচ্ছা আমি কালকে দিবো। আমার এখানে অনেক কষ্ট হয় মোবাইল ভূত। আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ। বলেই ফোন রেখে দিলো। আমি পরেরদিনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সারাদিন মাথায় ইলার কথা গুলো ঘুরলো। মানুষ যখন কারো সাথে মায়ায় জড়িয়ে যায়, তখন তার কথা সারাদিন মাথায় ঘুরতে থাকে। মস্তিষ্ক চায় সেই মানুষটার প্রতি মায়া আরেকটু বেড়ে যাক। মানুষের মস্তিষ্ক মাঝেমধ্যে ভুলভাল কাজ করে, মায়া বাড়িয়ে দেয়া সেই ভুলভাল কাজের মধ্যে অন্যতম।
পরেরদিন রাত ১২ টা বাজলো। ফোন আসছে না। লক্ষ্য করলাম আমার ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে। বারবার স্ক্রিণে তাকাচ্ছি। এভাবে রাত ১ টা বাজলো। এরপর ২ টা। এভাবে পুরো রাতটাই শেষ হয়ে গেলো। ইলার ফোন আসলো না। আমি ফোন দিলাম, ফোন যথারীতি বন্ধ। সেই থেকে এভাবে টানা এতদিন ধরে অপেক্ষা করে যাচ্ছি আমি। কিন্তু না, ইলা কখনো আর আমায় ফোন দেয় নি। আমি প্রতিদিন রাতে ইলার ফোনের জন্য বসে থাকি। মনে হয় এই বুঝি ইলা ফোন দিয়ে বলবে, মোবাইল ভূত আমায় নিয়ে যাও প্লিজ, আমি তোমাকে আমার ঠিকানা দিচ্ছি। আমি সেই ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে ইলাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। আচ্ছা ইলার কণ্ঠস্বরের কি অনেক পরিবর্তন হয়েছে? নাকি এখনো বাচ্চাবাচ্চা আছে? আমি জানি না। জানার কথাও না। আমার কাছে ইলা মানে সাড়ে চার বছর আগের বাচ্চা ইলা। মাঝেমধ্যে অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে, আমার বুকটা ধক করে উঠে। আমি কোনোকিছু না দেখেই ফোনটা রিসিভ করি। কিন্তু ‘সরি রং নাম্বার’ বলে ফোন টা আবার রেখে দিয়ে অফুরন্ত অপেক্ষায় আরো একটা রাত যোগ করি।

 

-সামিউল ইসলাম উৎস

Facebook Comments