‘ছোটদের স্মার্টফোন’-মোঃ শফিউল ইসলাম চৌধুরী(সাবিদ)

আম্মুর রুমে উঁকি দিতেই দেখি ছোট ভাই একদম কুঁজো হয়ে শুয়ে মোবাইল টিপছে আর হাসছে।ইদানীং তার মোবাইল এর প্রতি নেশাটা বেশ বেড়েছে।অন্য কারো মোবাইল না আবার তার নিজস্ব মোবাইল।

সবে মাত্র ২ পেরিয়ে ৩য় শ্রেণিতে পা দিয়েছে।বয়স ৯ বছর এর কাছাকাছি। অথচ এই বয়সে যে পটু সে মোবাইল চালানোতে।সেই বয়সে আমরা মাঠে গড়াগড়ি খাইতাম।আব্বুর খুব আদরের ও বিশ্বস্ত মানুষ তিনি।মানে যা আবদার করে তা মাটিতে পড়ার আগেই তার হাতে চলে আসে।

বর্তমানে যে মোবাইল টা তার নিজস্ব বা পারসোনাল বলে দাবি করে সেই মোবাইল টা আমার ছিলো।আব্বু অনুমতি পাশের পর সেটার মালিকানা এখন তিনি।আগে শুধু গেমস খেলায় সীমাবদ্ধ ছিলো,এখন ওয়াইফাই লাগানোর পর থেকে দেখি প্রায় সময় ইউটিউব এ ট্রিকস এন্ড হ্যাকস এর ভিডিও দেখে!আর অই বয়সে আমরা বল আর টেপ ছাড়া কিছু বুঝতাম না।

কিছুদিন আগে ফুফুর বাসা থেকে এসে দেখছি বেশ আনন্দের সহিত মোবাইল চালাচ্ছেন তিনি।কারণ ফুফাতো ভাই ও তার মতো,সমবয়সী। আবার তার কাছেও একটা মোবাইল আছে।আর এই ফুফাতো ভাইটি ছোট খাটো হ্যাকার!মানে গেমস হ্যাক করে কয়েন আর লাইফ টাইম বাড়িয়ে নে।আমার ছোট ভাইটাও সেগুলো শিখে নিজেকে এখন আমার সামনে হ্যাকার দাবি করে।

মাঝে মাঝে হুমকি দে আমার ফেসবুক বা অন্য সব কিছু হ্যাক করবে।এটার পাশাপাশি তিনি আরেকটা মহৎ কাজ করি ফেলছে এই স্মার্ট যুগে!আজকাল কার ছোট ছেলে এতোটা স্মার্টফোন কেন্দ্রিক যে তাদের কে সামলে রাখার জন্য একটা ফোন দিয়ে রাখতেই হয়।আগে আমাদের কে শর্ত দিয়ে গেইম খেলতে দিতো যে পড়া শেষ করলে দিবে।আর এখন কার ছেলে মেয়েদের কে কি শর্ত দিবে তারাই উল্টো শর্ত দে।

কয়েকদিন আগে সকালে উঠে গিয়ে দেখি মেসেঞ্জার এর টুং করে মেসেজ আসার শব্দ।আমার মোবাইল চেক করে দেখলাম, না আমার টাতে না।বাসায় দ্বিতীয় স্মার্টফোন টা ছোট ভাইয়ের।সে ঘুমে ছিলো,মোবাইল টা তার পাশ থেকে নিয়ে চেক করলাম!মোবাইল চেক করতেই চোখ আমার আকাশে উঠে গেছে,আর বলছে আজকে নামবো না।

সামনের রুমে আব্বু আম্মু নাস্তা করতেছিলো,গেলাম মোবাইল নিয়ে।
তার কীর্তি কলাপ শুনে আব্বু আম্মু হা হয়ে আছে।সৌভাগ্য বশত মবাইল এর লক জানতাম আমি।খুলে দেখি রীতিমত ফেসবুক,ওয়াটস এ্যাপ,ইমু,মেসেঞ্জার সাথে ইন্সট্রা আইডি খোলা!!!ভাবা যায় এসব?এই বয়সে এতো স্যোশাল তারা!

মেসেঞ্জার এ ঢুকলাম,দেখি এঞ্জেল ফারিয়া নামের আইডি থেকে মেসেজ!মনে মনে ভাবলাম হায়রে এই এঞ্জেল এর যুগ এখনী শেষ হয় নাই যে?ইমু তে বেশ কিছু মেসেজ।তবে সেখানে ফুফাতো ভাই,ছোট চাচাতো ভাই বোন গুলো কথা বলে গ্রুপ করে।এই বয়সে গ্রুপ ও শিখে গেছে!

এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ ভদ্রলোক ঘুম থেকে উঠে রেগে মেগে আমাকে বলে,

–আমার মোবাইল ধরছো কেন?
–এতো আইডি কেন মোবাইলে?ফেসবুক,মেসেঞ্জার এ কাজ কি?আর ইন্সট্রা আইডি কিসের জন্য এতো ছোট বেলায়?
–আমার মোবাইল আমি যা ইচ্ছে তা করবো!আমি সবার সাথে কথা বলি এসবে!

কথা টা শুনে টেনে একটা থাপ্পড় দিতে মন চাইছে শুধু মাত্র তাহার আলাদীনের চেরাগ সামনে ছিলো বলে দিতে পারি নাই।পরে আম্মুর অর্ডারে শুধু মাত্র ইমু আর মেসেঞ্জার ছাড়া সব বন্ধ করা হয়েছে।ছোট ফুফাতো, চাচাতো ভাই বোন গুলো ও সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে।কতোক্ষন ইমু তে গ্রুপ ভিডিও কল নইতো স্টিকার ফাইটিং।

এই যুগ টা এমন কেন?একটু বড় হতে না হতেই তাদের মোবাইল লাগে কেন?তাদের যদি বলি আমাদের ছোট বেলায় আমরা কত খেলাধুলা করছি,আর তারা জবাব দে হ্যাঁ আমরাও করি মোবাইলে!তখন ইচ্ছে করে হয় এরে মারি নয় আমার চুল আমি ছিঁড়ি!

আসলে এদের দোষ কি বা দিবো,যুগ টায় এখন স্মার্ট, আধুনিক! হাতের নাগালে স্মার্ট জিনিসপত্র পাওয়া যায়,যার কারণে এখনের ছেলে মেয়েরা বিকেলে মাঠের বদলে গেইমের ম্যাপে বেশি থাকে।খেলনার মোবাইলে গান গুলো শুনে যাদের সময় কাটানো উচিৎ তারা ইউটিউবে পড়ে থাকে।কালো সিলিট বা ব্ল্যাক বোর্ড(ছোট গুলো) এ যাদের লিখে সময় পার করার কথা তারা এখন মেসেজ আদান প্রদান এ ব্যাস্ত।

এরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে স্মার্ট ফোন বা গেজেট অপারেটিং এ।অনেক কিছু আমাদের আগে আগে বুঝে নিয়েছে।এরা কোথাও বেড়াতে গেলে শার্ট প্যান্ট এর স্টাইল এ খেয়াল থাকে না বরং মোবাইল টা কিভাবে নিলে আর হেডফোন টা কিভাবে সেটাপ করে কানে গুঁজলে ভালো দেখায় এই চিন্তায় থাকে।

একটা সময় ছিলো,যে আমরা স্কুল থেকে এসে কখন খেলতে যাবো সে চিন্তা থাকতো।বিকেলে সবাই মিলে মাঠে জড়ো হয়ে খেলার দিনটা নেই।স্টিলের পিস্তল,রাবারের পিংপং বল,লাটিম,মার্বেল আরো কতো কি ছিলো আমাদের শৈশবের সাথী। অথচ এখনের বাচ্চাদের এসব যেনো আগ্রহ নেই।তবে কিছু কিছু এখনো আছে যারা স্মার্টফোন পাই নি,বা তাদের পরিবারে দে নাই।তারা ছোট খাটো খেলনা দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

পুকুরে ঘন্টার পর ঘন্টা থেকে বকা খাওয়ার মজা যেমন বুঝবে না এরা তেমনি বিকেলে কারো একজনের পিঠে নাম্বারিং করে ক্রিকেট এর আনন্দ এরা পাবে না।এরা কোনোদিন গ্রামীণ শৈশবের স্বাদ পাবে না,কারণ তারা শুরুতেই ভুল যুগে চলে এসেছে।গ্রামে হয়তো কমই কেটেছে তাদের,তাই এসবের মজা বুঝবেও না তারা।

তবে আগামীর প্রজন্ম টা আরো ভয়াবহ।তার আরো বেশি আধুনিক আর স্মার্ট হবে।দেখা যাবে জন্মের পর নামকরণ এ তাদের উপহার স্বরুপ মোবাইল বা ট্যাব গিফট করা হবে!১ বছর জন্মদিনের উপলক্ষে আরো দামী কোনো স্মার্ট গেজেট দেয়া হবে।তারাও সেরকম স্মার্ট হবে!!!

এদের জীবন ইউটিউব,পাব্জি কিংবা আরো নানান গেইমে সীমাবদ্ধ।সন্ধ্যা তে একসাথে সবাই চিল্লাই চিল্লাই পড়ালেখার মজা এরা যে আর পাবে না,হঠাৎ কারেন্ট চলে যাওয়ার অনুভুতি তারা বুঝবে না।রাতে চাঁদের আলোতে কানামাছি আর লুকোচুরি এরা দেখবেই না!আফসোস!!!

বিঃদ্রঃ সম্পূর্ণ নিজের চিন্তা থেকে লিখা,কারো সাথে মিল রেখে বা তাদের কে খারাপ বলার উদ্দেশ্য লিখা নয়।তবে এসব চোখে পড়ছে সারাক্ষণ তাই প্রকাশ।তবে তাদের চেয়েও দোষ টা বেশি যুগের!

Facebook Comments