‘না তে ধর্ষণ’

মোঃ শফিউল ইসলাম চৌধুরী (সাবিদ)//

রাস্তার ধারে ময়লার ঝোপে এক অজ্ঞাত লাশ।তাও রক্তাক্ত শরীরে।তাই কেউ সাহস করে ধরে দেখছে না,দূর থেকে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে দেখছে।পুলিশকে কল দিয়েছে কয়েকজন।কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে লাশ টি মেডিকেল পাঠিয়ে দে ময়না তদন্তের জন্য।আর অইখানের লোকাল মানুষদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে যায়।

লাশটি একটি মেয়ের।খুব সম্ভবত কলেজে পড়ুয়া এক ছাত্রীর।গায়ে এখনো কলেজের সাদা এপ্রন। তবে গায়ের কাপড় ভর্তি রক্ত।তার ব্যাগ আর আইডি কার্ড অনুযায়ী মেয়ের বাবা মা’কে জানানো হয়।

ফোন কল এর কিছুক্ষন এর মধ্যে থানায় মেয়ের বাবা মা হাজির।কান্না জড়িত অবস্থায় দুজন।তবে বাবা একটু শক্ত থাকার মিথ্যা ভান করছিলো।হাজার হলেও নিজের একমাত্র মেয়ের মৃত্যুর খবরে কে শক্ত থাকে?

মেয়েটির নাম রিতু চৌধুরী।ঢাকা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী।বাবা মা’র একমাত্র মেয়ে।বাবা জব করেন আর মা গৃহিণী।ছোট সংসারে ভালোই দিন যাচ্ছিলো।কিন্তু হঠাৎ এ কেমন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো তা তারাও বুঝতে পারছেন না।

রিতুর মা থানায় কান্না করতে করতে দুইবার অজ্ঞান হয়েছেন।বাবা বিপাকে পড়ে গেছে কেমনে সামলাবে।পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ এ জানতে পারে প্রতিদিন এর মতোই কলেজ এ গেলেন রিতু কিন্তু প্রতিদিনের মতো সুস্থ স্বাভাবিক ফিরে নি সে।রিতুর বাবা মা’কে বাসায় চলে যেতে বলা হলো।লাশ হস্তান্তর করা হবে কাল সকালে।

পরের দিন সকালে লাশ নিয়ে তাদের বাসায় গেলেন পুলিশ।আর সাথে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও হাতে ছিলো।রিতুর লাশ দেখে তার আবারো বিলাপ কান্নায় অজ্ঞান হয়ে পরেন।সব কাজ কর্ম সেরে রিতুকে দাফন করা হয় আজিমপুর কবর স্থান এ।শেষ বারের মতো আদরের মেয়েকে মাথায় হাত বুলিয়ে চিরনিদ্রা সজ্জায় শুইয়ে দিয়ে আসেন বাবা।এদিকে মা কান্নায় পাগল হওয়ার মতো।

পুলিশ জানান রিপোর্টে আসে রেইপ এন্ড মার্ডার।প্রথমে হিংস্রতার সহিত ধর্ষণ করা হয় এরপর বিভিন্ন ভাবে টর্চার করে মেরে ফেলা হয়।তাই সারা শরীর রক্ততে ভরা!বাবা মায়ের কাছে রিতুর ব্যাপারে জানতে চাইলে তার বাবা মা জানান,রিতু খুব শান্ত প্রকৃতির ছিলেন,পড়ালেখায় ও ভালো ছিলেন।ভালো গ্রেডে পাশ করে ঢাকা কলেজ এ সায়েন্স এ ভর্তি হয়।

বাবার খুব আদুরে ছিলেন।উল্টাপাল্টা চলা ফেরা তেও ছিলেন না,কলেজ যেতে আর বিকেলে ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতো।তার কয়েকজন বান্ধবী ছিলো খুব ক্লোজ।এর বাইরে আর কারো সাথে মিশতো না সে।পছন্দের কাজ ছিলো ডায়েরি লিখা আর গল্প পড়া।মাঝে মাঝে মুভি ও দেখতো সে।এসব ছিলো বাবা মায়ের উক্তি।

তার বান্ধবী দের জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানায় সেদিন রিতু কলেজ যাই নি।তাকে কল দিয়েও পাই নি তারা।ভেবেছে শরীর খারাপ তাই যাবে না,পরে শুনে সে আর নেই।রিতুর সাথে ইদানীং কারো ঝগড়া বা ঝামেলা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে তারা বলে সে কারো সাথে কখনো চিল্লাই কথা বলে নি।তবে কিছুদিন ধরে সে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত ছিলো বলে মনে হয়েছে।কিন্তু কি তা আমাদের ও বলে নাই।

কিছু ঘটনা তদন্ত এর জন্য রিতুর ঘর সার্চ করে পুলিশ।যদিও বাবা মায়ের মতেই।কিন্তু তেমন সন্দেহজনক কিছু পায় নি পুলিশ।তার পড়ার টেবিলে পাঠ্য বইয়ের সাথে বেশ কিছু বই ছিলো।সাথে একটা ডায়েরি ছিলো।তদন্তের খাতিরে ডায়েরি টি খুলে পুলিশ।প্রথমে কিছু দৈনন্দিন কথা লিখা থাকলেও কলেজের শুরুর বেশ কিছু সুন্দর ঘটনা বা মোমেন্ট এর কথাও ছিলো।এরপর চার মাস আগের একটা লিখা ছিলো একটা ছেলেকে নিয়ে।আগ্রহ সহিত পুলিশ ও রিতুর মা বাবা সেটি পড়তে থাকে।

ডায়েরি থেকেঃ

৪মাস আগেরঃ

জীবনের প্রথম অপরিচিত কারো সাথে কথা বললাম।তাও ফেসবুকে আলাপ।ছেলেটির নাম সাদেক।এখনো তার সম্পর্কে জানা হয় নি।

তার কয়েকদিন পর…

সাদেক এর সাথে আমার ভালোই বন্ধুত্ব হয়েছে।ছেলেটা বেশ ভালো আর মজার।অল্পতেই কেমন জানি আমাকে মানিয়ে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে।

আরো কিছুদিন পর…

বন্ধুত্ব টা মনে হয় ভালোলাগা তে পরিনত হচ্ছে।ছেলেটা বেশ কেয়ারিং। আর খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে।কেমন জানি তাকে ভালো লাগতে শুরু হয়েছে,কিন্তু বলা হয় নি।এখন মেসেজ এর সাথে ফোনেও কথা হয় আমাদের।দেখতে ভিষণ সুন্দর। ভালো লেগে যাওয়ার মতো।মায়া কাজ করে সাদেক এর মধ্যে।

বেশ কিছুদিন পর….

সাদেক আমায় প্রোপোজ করলো।ইস! কি কিউট ছেলেটা।এখনো জবাব দি নাই।আম্মু আব্বু কে কি বলবো?তারা যদি ভুল বুঝে আমায়?না বলা যাবে না।আপাতত কাউকে বলা যাবে না।

ইদানীং সাদেক দেখা করার জন্য বলছে।কিন্তু আগে কখনো এভাবে অপরিচিত কারো সাথে দেখা করি নি।তাও আবার ছেলে!আর বান্ধবী দের বলা হয় নি সো তাদের নিয়েও যাওয়া যাবে না।কিন্তু দেখা কি করবো?করা তো যাই,খারাপ না ছেলেটা।কেমন জানি অনুভূতি হচ্ছে আমার।এরকম কখনো হয় নি।প্রেমের প্রস্তাব টাও পুরাপুরি গ্রহন করি নি।তবে ফিরিয়ে দিবো না তাকে।ভালোলাগে আমার।মনে মনে ভালোও বেসে ফেলেছি….।

পরিচয় এর ২ মাস পর….

আজ প্রথম সাদেক এর সাথে দেখা হলো।ছেলেটা আসলেই কিউট।প্রথম দেখাতেই প্রোপোজ করলো সামনা সামনি।তাও আবার হাটু গেরে গোলাপ দিয়ে।থমকে গেছিলাম তখন,কি বলবো!গোলাপ নিবো কি নিবো না?না নিয়েও পারবো না তার পাগলামির জন্য।আসলেই ভালো ছেলেটা।পরম যত্ন করে অনেকক্ষণ শহর ঘুরালো বাইকে করে।।।অনেক প্রেম ভালোবাসা হয়ে গেলো।ইস

এরকম প্রতিদিনের প্রেম ভালোবাসা, দেখা আড্ডার কথা লিখা ছিলো আরো অনেক।

এসব পড়ে রিতুর মা আবারো কান্নায় ভেঙে পরে।বাবা শান্তনা দিতে থাকে।

তারা আবারো ডায়েরি পড়া শুরু করে,

সেখানে আর কিছুদিন পরের একটা লিখা ছিলো যে

এইবার সাদেক এর কথা আব্বু আম্মু কে বলবো,আর লুকাবো না।আর আশা করি আব্বু আম্মু মানা করবে না।কারণ সাদেক ভালো ফ্যামিলির ছেলে।

৩ মাস পর…

সাদেক ইদানীং আমাকে দেখতে সারাক্ষণ পাগলামি করে।তার শখ মিটাতে রাত বেরাতেও ছবি পাঠাতে হয়।বেশ পাগলামো করে আজকাল।

এর কয়েকদিন পর…

সাদেক এর যেনো ছবিতেই মন ভরছে না,ভিডিও কলে বসে থাকে প্রায় সময়।এসব পাগলামির মানে হয়???

ইদানীং সাদেক যেনো নরমাল ছবিতে সন্তুষ্ট নই,কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে ও।বেশ আপত্তিকর কথা বার্তা বলে আজকাল।আর আপত্তিকর ছবি চাই।দিবো না বললে ইদানীং গরম হয়ে খারাপ ব্যাবহার করে। কি করবো আমি?বাট ও তো এমন ছিলো না!তাইলে এখন কেন এমন করছে।ভালোবাসাতে কি এগুলো খুব দরকার?আব্বু আম্মুকে কি জানাবো?কিচ্ছু মাথায় আসছে না!

লাশ পাওয়ার কিছুদিন আগের লিখাঃ

সাদেক এর সাথে মনে হয় আর বেশিদিন থাকা যাবে না আমার।পাগল টা চেইঞ্জ,কিউট টা তার রুপ বদলাচ্ছে।উল্টা পাল্টা কথা কিংবা ছবি চেয়ে বেড়ায়। খারাপ প্রস্তাব দে।অনেক বুঝিয়েছি,তাও ইদানীং এমন করছে!কি করবো এখন।আমার পক্ষে তার প্রস্তাব মেনে বিয়ের আগে এসব করা সম্ভব না।তাও তার বাসায় গিয়ে একলা সময় পার করা কখনোই সম্ভব না।তাহলে ভালোবাসা কি এসব এর কাছে হেরে যাবে?

সব আপত্তিকর প্রস্তাব কে না করে সাদেক এর সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিলাম।কষ্ট হচ্ছে অনেক,অল্প কয়েকদিনে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলছি।তাও সে বুঝলো না।তার কাছে ভালোবাসার চেয়ে আমার দেহ টাই সব!ছিঃ এমন কেন এরা?এরকম তো চাই নি।আরো ভেবেছি আব্বু আম্মুকে পরিচয় করিয়ে সব খুলে বলবো।কিন্তু এরকম নোংরা মানসিকতার মানুষের সাথে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না।কষ্ট হবে তাও এসব ও যাওয়া যাবে না।।।

এটাই ছিলো রিতুর শেষ লিখা।এটা পড়ে পুলিশ ও রিতুর বাবা মা’র সন্দেহ জাগে।ধর্ষণ আর খুন এর পিছনে হয়তো সাদেক এর হাত রয়েছে।পুলিশ ডায়েরি তে কিছু তথ্যের ভিত্তিতে সাদেক এর খোঁজ নে।

সাদেক এর খোঁজে পুলিশ তার বাড়িতে গেলে জানে সে পলাতক।বাসার কেউ জানে না সে কোথায়,আর বাসার সাথেও তার তেমন যোগাযোগ থাকে না।আরো কিছু তদন্ত ও অভিযানের মাধ্যমে তার সাথে থাকা কিছু সাথীদের গ্রেফতার করে পুলিশ।

জবাবদিহিতে তারা জানায় এটা সাদেক এর প্রথম কাজ না।এর আগেও এমন অনেক মেয়ের জীবন ধ্বংস করেছে সে।প্রথমত প্রেমের ফাঁদে ফেলে, ভালো কথা বার্তা বলে পরে আপত্তিকর কাজে মেয়েদের জড়ায় এবং পরে তাদের খোঁজ ও নে না আর!

কিন্তু রিতুর ক্ষেত্রে ভিন্ন ছিলো।সে প্রস্তাবে রাজি না হলে সাদেক প্ল্যান করে রিতুকে তুলে এনে ধর্ষণ করবে।এরকম জানায় তার সাথীরা।।এরা আরো জানায় যে সেদিন তাদের সহযোগিতায় সাদেক রিতুকে তুলে নিয়ে যায় কলেজ যাওয়ার সময়।সেদিন সাদেক তার ক্ষোপ সব একসাথে করে রিতুকে নির্মম ভাবে ধর্ষণ করে।কারন সাদেকের প্রস্তাব না করলে সে তাকে ছাড়ে না।

সেদিন টানা ধর্ষণ করে রিতুকে।সাথে সাদেক এর সাথীরাও।অনেক চেষ্টা করেছিলেন পশুদের হাত থেকে বেঁচে আসার।কিন্তু তা আর হয় নি।নির্মম ভাবে ধর্ষণের পর রিতুর আর বাচঁতে ইচ্ছে করলো না।অবশেষে তাদের হাতেই খুন হয় রিতু।পরে রিতুর রক্তাক্ত দেহ ঝোপে ফেলে দিয়ে আসে সাদেকের সাথীরা।

এখানে থেমে যায় হাজারো রিতু।

এরকম হাজারো রিতু ধর্ষণ হচ্ছে দিনের পর দিন।হয়তো খারাপ প্রস্তাবে না করার ফলে,অথবা টার্গেট এ পড়লে।আর সাদেক রা এরকম হাজারো নারীর জীবন নিয়ে খেলেও আবারো সাহস করছে!

বি.দ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com