রান করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে মুশফিকের

বিশেষ সংবাদদাতা : আমজনতার কথা নয়। ক্রিকেট অভিধানের বহুল প্রচলিত বাক্য, ‘উইনিং ইজ এ হ্যাবিট’। সত্যিই তাই, নিয়মিত জেতার জন্যও অভ্যাস লাগে। এ কথাকে একটু ঘুরিয়ে যদি বলা হয়, ‘রান করাও একটা অভ্যাস’, সেটা বলা নিশ্চয়ই ভুল হবে না?

বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেই রান করাটা রীতিমত অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন অভিজ্ঞ নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহীম। হোক তা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, বিপিএল কিংবা ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট লিগ- সব আসরে মুশফিকুর রহীমের রান করা চাই’ই চাই।

মুশফিক খেলতে নামবেন আর রান করবেন- এটা এখন আর শুধু তার অভ্যাসেই পরিণত হয়নি, যেমন নিয়মেও পরিণত হয়েছে। অতি বড় সমালোচকও মানছেন, মুশফিকের রান ক্ষুধা, ভাল খেলার ইচ্ছে ও লম্বা ইনিংস গড়ার দৃঢ় সংকল্প যে কারও চেয়ে বেশি।

আজ (রোববার) শেরে বাংলায় শুরু হওয়া বঙ্গবন্ধু ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের উদ্বোধনী দিনে সে চেনা ও জানা সত্যের দেখা নতুন করে চোখে পড়ল। ক্যারিয়ারে আবাহনীর হয়ে প্রথম খেলতে নেমেই অনবদ্য শতরান মুশফিকের ব্যাটে।

যিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কিংবা বিপিএলে যে কারও বিপক্ষে ব্যাট হাতে নেমে প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করছেন, শতরান করছেন অবলীলায়, সেই মুশফিক ঢাকা লিগে সেঞ্চুরি করতেই পারেন। তা পারেন অতি অবশ্যই। তবে আজকের শতকটি অন্য আট-দশটা শতরানের মত নয়।

এদিন পারটেক্স স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে টস জিতে ব্যাট করতে নামা আবাহনীর অবস্থা ভাল ছিল না মোটেও। শুরুটা ছিল একদম যাচ্ছেতাই। যার ব্যাট এখন খোলা তরবারি, সেই লিটন দাস (০) আর নিজেকে ক্রমেই বড় মঞ্চের পারফরমার হিসেবে গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়া নাঈম শেখ (০) যখন ফেরেন সাজঘরে, বোর্ডে রান তখন মোটে ৬।

বিপর্যয়ের সেটাই শেষ নয়। দলীয় ৬৭ রানের মধ্যে খোয়া গেল ইনিংসের অর্ধেকটা। আরও আউট হলেন নাজমুল হোসেন শান্ত (১৫), আমিনুল ইসলাম বিপ্লব (১৪) আর আফিফ হোসেন ধ্রুব (৩)। অবস্থাটা এমন ছিল, চার নম্বরে নামা মুশফিক রানের খাতা খোলার আগেই অপরপ্রান্তে একের পর এক উইকেট পড়ছে।

দলের সংকটে বিপদে শুরুতে রান করার চেয়ে উইকেটে থাকা জরুরি- এ কঠিন সত্য মুশফিকের চেয়ে ভাল আর কে বোঝে? তাই তো আজ পারটেক্সের দুই আনকোরা পেসার জয়নুল ইসলাম আর রনি হোসেন যখন আবাহনীর তারকাশোভিত লাইনআপকে চেপে ধরেছেন, তখন সতর্ক-সাবধানি মুশফিক রান করার চেয়ে একদিক আগলে রাখার কাজটিই করলেন প্রথম।

শুরুতে ২৩ বল রানই করেননি। ২৪ নম্বর ডেলিভারিতে ডাবলস দিয়ে খোলেন রানের খাতা। তারপর ধীরে ধীরে ইনিংসকে সাজিয়েছেন। সিঙ্গেলস-ডাবলসে এগিয়ে চলা। এক সময় ৭৫ বলে হলো হাফসেঞ্চুরি, তিন বাউন্ডারি আর দুই ছক্কায়। সঙ্গে বিশ সিঙ্গেলস আর তিনটি ডাবলস। ২৪ বলে প্রথম রান করে ৭৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি, তার মানে স্ট্রাইকরেট ধরলে, রানের খাতা খোলার পর একশর কাছাকাছি স্ট্রাইকরেটে ৫০’এ পা রাখা।

পরের ৫০ আসলো আরও দ্রুত, ৩৬ বল থেকে। সেখানেও সিঙ্গেলস (২০) নেয়ার এতটুকু সুযোগ হাতছাড়া করেননি। সাথে দুটি ডাবলস ও একটি তিন। আর বাউন্ডারির হিসেব পাঁচ চার আর এক ছক্কা।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে ক্রিজে যাওয়া। আর ৪১ নম্বর ওভারে তিন অঙ্কে পৌঁছে যাওয়া; ঐ ওভারের প্রথম দুই বলে ৯৫ থেকে পরপর দুই বলে পয়েন্ট ও এক্সট্রা কভার দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে শতরান পূর্ণ করা।

শেষ পর্যন্ত আউট হলেন ৪৫ নম্বর ওভারে। পারটেক্সের দীর্ঘদেহী পেসার জয়নুলের বলে স্লগ করতে গিয়ে মিসটাইম করে ৩০ গজের ভিতরে উঁচু ক্যাচ দিয়ে মুশফিক যখন সাজঘরের পথে, আবাহনী তখন শুরুর চরম বিপদ কাটিয়ে রীতিমত মজবুত অবস্থানে। বোর্ডে রান তখন ২২৭।

শুরুতে ২৩ বলে রান না করে মুশফিকের অসাধারণ শতকের ইনিংস শেষ হলো ১২৪ বলে ১২৭ রানে। তার মানে ঠিক ১০০ বলে ১২৭ রান। স্ট্রাইকরেট ১২৭.০০। একদিনের ক্রিকেটে অনেক।

দলের বিপদে রয়েসয়ে খেলা। তারপর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে রান করায় মনোযোগি হওয়া- এটাই মুশফিক। আর তাই তো আলগা বলগুলোকে কাজে লাগিয়ে বাউন্ডারি আর পারটেক্সের বাঁহাতি স্পিনার শাহনাজ চৌহানের বলে তিনটি আর অফস্পিনার মঈন খানের বলে একটি করে ছক্কা হাঁকিয়েছেন অবলীলায়।

আবাহনী যে এই এতটা পথ মুশফিকের একার হাত ধরেই এসেছে, তা নয়। সঙ্গে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ভূমিকাও আছে। আবাহনীর গতবারের অধিনায়ক মোসাদ্দেক সৈকত সাত নম্বরে নেমে এবারের অধিনায়ক মুশফিকের সঙ্গে দলের বিপদে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে মুশফিক আর মোসাদ্দেক জুড়ে দেন ১৬০ রান। যাতে মোসাদ্দেকের অবদান ছিল ৭৪ বলে ৬১। সেই গত বছর নভেম্বরে ভারত সফরের একাংশে মায়ের অসুস্থতার কারণে হঠাৎ দেশে ফিরে জাতীয় দলের বাইরে মোসাদ্দেক। তারপর বিপিএলেও খুব ভাল খেলেননি। আজ আবাহনীর হয়ে প্রথম ম্যাচে মোসাদ্দেকের ব্যাটে রান নিশ্চয়ই করে আকাশী হলুদ শিবিরে অন্যরকম স্বস্তি।

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com