মার্চ ৮, ২০২১

Latest News Before Everyone in Bangladesh

শ্লীলতাহানি

১ min read

মুহম্মদ আলতাফ হোসেন ।।

দেশে অন্য সব অপরাধের সঙ্গে ধর্ষণও অব্যাহত রয়েছে। সব খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হলেও বাস্তবে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। কোনো কোনো দিন বিভিন্ন বয়সের কয়েকজন পর্যন্ত নারী ধর্ষিতা হচ্ছে। কিন্তু কখনো আইনের মারপ্যাঁচ খাটিয়ে, কখনো আবার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকড়াও করা দূরে থাক, তাদের এমনকি চিহ্নিতও করা হচ্ছে না। এমন অবস্থার সুযোগেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ধর্ষক অপরাধীরা। তাদের শিকার হচ্ছে নতুন নতুন নারী। এরকম সর্বশেষ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী। গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, ক্লাস শেষ করে এই ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়েরই টঙ্গি পর্যন্ত রুটের দোতলা বাসে চড়ে কুর্মিটোলা গিয়ে নামার পর তার ওপর প্রথমে হামলা চালানো হয়। গলা ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করলে সে অচেতন হয়ে পড়ে। এরপর এয়ারপোর্ট অভিমুখী ব্যস্ত সড়কের পাশে এক নির্জন স্থানে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। রাত দশটার দিকে জ্ঞান ফিরলে ওই ছাত্রী একটি সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে কাছাকাছি এক বান্ধবীর বাসায় যায়। সবকিছু শোনার পর ওই বান্ধবী তাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অন্য সহপাঠীদের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করে। সহপাঠীরা চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। সেখানে জরুরি চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি তার শরীরের অবস্থাও পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা। পরীক্ষায় ধর্ষণের সকল আলামত স্পষ্ট ধরা পড়ে। পুলিশের তদন্তকারীদের কাছেও সেকথা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। অন্যদিকে ঘটনা জানার পর ধর্ষিতা ছাত্রীর পিতা নিজে বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। ডিবি ও সিআইডিসহ পুলিশের কয়েকটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে ব্যাগসহ ছাত্রীর ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস উদ্ধার করেন। কালো রঙের একটি জিনসের প্যান্ট এবং ফেন্সিডিলের কয়েকটি খালি বোতলও পড়ে থাকা অবস্থায় পেয়েছেন তারা। এসবই ধর্ষকের বলে ধারণা করা হয়েছে। আক্রান্ত ছাত্রী জানিয়েছে, ধর্ষক ছিল একজন। জ্ঞান হারানোর আগে পর্যন্ত সে ওই ধর্ষকের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করেছে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য চিৎকারও সে কম করেনি। কিন্তু ব্যস্ত সড়কের কেউই তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।
ছাত্রীর শ্লীলতাহানির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরাও এসব মিছিল-সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করা হয়েছে। ধর্ষককে গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দেয়ার দাবিতে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে ধর্ষক গ্রেফতারও হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, আইনের শাসন না থাকায় এবং কোনো একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি না হওয়ার কারণেই নারী নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ বা প্রতিহত করা যাচ্ছে না। অপরাধীরা বরং প্রশ্রয় পাচ্ছে, তাদের সাহস বেড়ে যাচ্ছে এবং তারা নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমন অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির কোনো ঘটনা জানাজানি হওয়া মাত্র মামলা দায়ের ও অপরাধীকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত করে স্বল্প সময়ের মধ্যে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীসহ বিশিষ্টজনেরা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানিসহ নারী নির্যাতন এতটাই ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, পরামর্শের আড়ালে বিশিষ্টজনদের দেয়া অভিমতের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। বস্তুত কোনো অপরাধের জন্য বিচার ও শাস্তি হচ্ছে না বলেই নারী নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা সকল সীমা অতিক্রম করে চলেছে। এজন্যই ঘটনাক্রমে শুধু অপরাধীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়াকেই আমরা অপরাধ দমন ও নির্মূল করার জন্য যথেষ্ট মনে করি না। ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে ফাঁসি ছাড়াও বিশেষ কোনো শাস্তি দেয়া যায় কি না সে ব্যাপারে আইন বিশারদদের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই আইনের ফাঁক গলিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাদের কোনো শাস্তিই হয় না। একই কারণে অপরাধও বন্ধ বা নির্মূল হয় না। আমরা চাই, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা হোক- যার ফলে কেউ কোনো নারীকে ধর্ষণের চিন্তা পর্যন্ত করার সাহস না পায়। সরকারের উচিত ঘটনাক্রমে কঠোর শাস্তি দেয়ার বহুবার উচ্চারিত ধমকের পুনরাবৃত্তি করার পরিবর্তে বাস্তবে কিছু করে দেখানো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্যাতিত ছাত্রীর ধর্ষককে কঠোর শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সরকার তৎপর হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা করতে চাই।
লেখক পরিচিতি:
মুহম্মদ আলতাফ হোসেন(সাংবাদিক ও কলামিস্ট)
সভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা

Facebook Comments