পাথরঘাটায় বিস্ফোরণে স্বপ্ন পূরণ হলো না এ্যানি বড়ুয়ার

দেশীয় ডেস্ক :

চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় বিস্ফোরণে নিহতের স্বজনদের আহাজারি আর আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশ। প্রিয়জনের নিথর মরদেহ দেখে লাশঘরের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অনেকে। কেউ দরজা ঘরে ঢুকে দেখছেন নিহতদের সারিতে স্বজনদের কেউ আছে কীনা। অন্যদিকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চলছে আহতদের গণনবিদারি আর্তনাদ।

রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতাল গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের কাছেই লাশ ঘরে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে সাতটি মরদেহ। ঘরটির সামনেই নির্বাক হয়ে হাত-পা ছেড়ে বসে আছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলী পলাশ বড়ুয়া। ভেতরে পড়ে আছে জীবনসঙ্গিনী পটিয়ার মেহের আঁটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা এ্যানি বড়ুয়ার নিথর দেহ।

তিনি জানালেন, সকালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য বাসা থেকে বের হন তিনি। পায়ে হেঁটে অল্প কিছুদূর যেতেই বিস্ফোরণে ধসে পড়া দেয়াল চাপা পড়েন তিনি। আর পরীক্ষার ডিউটি করা হলো না তার। মারা যান ঘটনাস্থলেই।

লাশঘরের একটু দূরে বিলাপ করছিলেন সাদিয়া (২২)। একই ঘটনায় দেয়াল চাপা পড়ে মারা গেছেন সাদিয়ার স্বামী নুরুল ইসলাম (৩২)। মাত্র তিন বছর আগে বিয়ে হয় তাদের। দুই বছরের এক শিশু কন্যা রয়েছে তার।

বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, শাহ আমানত সেতুর কাছে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। স্বামী রং মিস্ত্রির কাজ করেন। সকালে ঘর থেকে কাজে যাবার কথা বলে বের হয়েছিলেন। পরে শুনি দেয়াল চাপা পড়ে মারা গেছেন তিনি। অবুঝ মেয়েকে নিয়ে এখন আমি কোথাও যাবো। এসময় দুই বছরের অবুঝ শিশু জান্নাতও মায়ের সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়ে ।

পলাশ বড়ুয়া, সাদিয়াদের মতো অনেকের কান্না আর আহাজারি চলছে হাসপাতাল আঙিনাজুড়ে।

স্বজনদের খবর নিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ ছুটে যাচ্ছে হাসপাতালে। তাদের আহাজারি দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না সেখানে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সংবাদকর্মীসহ অনেকে।

সকাল ১১টার দিকে হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পাথরঘাটায় বিস্ফোরণের ঘটনায় মোট ১৭ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। এদের মধ্যে ৭ জনকেই কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাকি ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে অন্তত চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

তিনি বলেন, আহতদের মধ্যে ২জন বার্ন ইউনিটের রয়েছেন। বাকিদের অন্য ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে লাশ ঘরে সামনে উপস্থিত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার বিজয় বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় যারা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে যতটুকু জানা গেছে, পাথরঘাটা ব্রিক ফিল্ড রোডের কুঞ্জমনি ভবনের নিচতলার একটি বাসায় সকাল নয়টার দিকে অর্পিতা নামে এক নারী আগুন জ্বালানোর জন্য দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় ভবনটির দু’টি দেয়াল ধসে পড়ে। হতাহতদের বেশির ভাগই দেয়াল চাপা কিংবা ইটের আঘাতের শিকার।

তিনি বলেন, বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন অনুসন্ধান করছেন। তবে, সম্ভবত ওই বাসায় গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস বের হয়ে পড়েছিল কিংবা গ্যাসের চুলা খোলা থাকার কারণে পুরো বাসায় গ্যাস জমে গিয়েছিল- এমনটি হতে পারে।

Facebook Comments