জীবন বীমা কি, কেন করবেন এবং এর সুফল সমূহ

বীমা হলো একটি চুক্তি। ইহা দুই পক্ষের মধ্যে একটি আইন সম্মত চুক্তি। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দিবে বলে নিশ্চয়তা দিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। অন্যপক্ষ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট হারে প্রিমিয়াম প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। প্রথম পক্ষ বীমাকারী এবং দ্বিতীয় পক্ষ বীমাগ্রহীতার মধ্যে যথাক্রমে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং প্রিমিয়াম প্রদানের নিশ্চয়তা সম্বলিত একটি চুক্তি। জীবন বীমার ক্ষেত্রে ক্ষতি পূরণ হয় না, মানুষের জীবনের কোন মূল্য পরিমাণ করা যায় না। তাই জীবন বীমার ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করা হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে জীবন-বীমা নিয়ে নানা ধোঁয়াশা রয়েছে, রয়েছে অনেক বিভ্রান্তি। অনেকে মনে করেন, এটি শুধুই বৃদ্ধ বয়সে একটু সহায়তার জন্যে। আবার কেউ কেউ ভাবেন ১০, ১৫ বা ১৮ বছর পর মেয়াদ পূর্ণ হলে যে ক’টি টাকা পাবেন, তা অতি তুচ্ছ। বাস্তবে তা নয়। প্রায় এক ডজন বিষয় আছে, যেসব কারণে জীবন-বীমা করা উচিত।

যদি আপনি না থাকেন

মানুষের জীবন-মৃত্যু সবই সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমরা কেউ-ই প্রিয়জনদের হারাতে চাই না। তবু এই নির্মম সত্যের মুখোমুখী আমাদের অনেককেই হতে হয়। ধরুন, এটি আমার-আপনার ক্ষেত্রে হলো। হঠাৎ করে আপনি বা আমি নেই। তখন শুধু প্রিয়জন হারানোর শোকের ধাক্কাই নয়, একটা আর্থিক সংকটের মুখোমুখিও আমাদেরকে হতে হয়। একটি জীবন-বীমা পলিসি এই ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের একটু সাহস জোগাতে পারে প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলে নিতে।

নিয়ম অনুসারে, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পলিসিধারীর মৃত্যু হলে তার পরিবার পলিসির পূর্ণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ধরা যাক, রফিক উদ্দিন ২০ লাখ টাকার একটি পলিসি করেছেন। মেয়াদের আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার পরিবার পুরো ২০ লাখ টাকাই পাবে, যা তাদের আর্থিক সংকটের তীব্রতা থেকে রক্ষা করবে।

চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহে সহযোগিতা

অনেক জীবন-বিমা পলিসিতে কয়েকটি রোগ চিকিৎসা ও দূর্ঘটনার বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত থাকে। এমন পলিসির ক্ষেত্রে কেউ দূর্ঘটনায় পড়ে অঙ্গ হারালে প্রযোজ্য আর্থিক সহায়তা পাবে। যদি গ্রাহকের পলিসিতে এ বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত থাকে, তাহলে দূর্ঘটনায় পড়ে হাতের কোনো একটি আঙ্গুল হারালে তিনি পলিসির মোট টাকা এক-চতুর্থাংশ পাবেন। তার ২০ লাখ টাকার পলিসির ক্ষেত্রে তিনি ৫ লাখ টাকা পাবেন।

কিডনি বিকল, হার্ট অ্যাটাকসহ কয়েকটি রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা বাবদ নির্দিষ্ট অংকের অর্থ পাওয়া যায়।

ঋণ পরিশোধে সহায়তা

কেউ-ই চায় না, নিজের মৃত্যুর পর পরিবার তার রেখে যাওয়া ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ুক। সে ঋণ হতে পারে আবাসন ঋণ, হতে পারে গাড়ি কেনার ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ অথবা ক্রেডিট কার্ডের ঋণ। নির্ভরশীলতার জায়গাটি হারিয়ে এমনিতে পরিবারের সদস্যরা অসহায় হয়ে পড়ে; তার উপর বড় অংকের ঋণের চাপ থাকলে তারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে। জীবন-বীমার পলিসির টাকা ঋণ শোধের মাধ্যমে তাদেরকে ভারমুক্ত করতে পারে।

দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক

জীবন-বীমা পলিসি দীর্ঘ মেয়াদী লক্ষ্য পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনা, সন্তানের উচ্চ শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে দারুণ সহায়তা পেতে পারেন আপনি।

বেসরকারি চাকরিজীবীদের অবসর পরবর্তী সুবিধা

সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্রাচুইটি ইত্যাদির পাশাপাশি পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা তাদের অবসর পরবর্তী জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। এ ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বেসরকারি চাকরিজীবী এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জীবন-বীমা আপনার অবসর পরবর্তী জীবনে কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারে।

কর সুবিধা

জীবন বীমার ক্ষেত্রে কিছু কর সুবিধা পাওয়া যায়। প্রতি বছর বীমার প্রিমিয়াম হিসেবে যে অর্থ জমা করা হয়, তা কর মুক্ত।

চাপে পড়ে সঞ্চয়

অনেক সময় জীবনে সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমা যা-ই আয় করি না কেন, তা নানাভাবে ব্যয় হয়ে যায়। দৈনন্দিন পারিবারিক ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার খরচ, বিয়ের অনুষ্ঠান, জন্মদিন ইত্যাদি সামাজিকতা, বেড়াতে যাওয়া, নতুন আসবাব বা ইলেকট্রনিক গেজেট কেনা- ব্যয়ের জন্য খাতের অভাব নেই। এভাবে চলতে চলতে দেখা যায়, হিসাবের খাতা একেবারেই শূন্য। একটি জীবন বীমা পলিসি থাকলে সেটি সচল রাখতে বাধ্য হয়ে প্রিমিয়াম জমা দিতে হয়। আর এভাবে ধীরে ধীরে কিছু সঞ্চয় হতে থাকে, যা এক সময়ে বড় আকারে পরিণত হতে পারে।

ভবিষ্যত নিয়ে স্বস্তি

মৃত্যু অনিবার্য। এটিকে এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই মৃত্যু নিয়ে মানুষের মনে তেমন উদ্বেগ কাজ করে না। উদ্বেগ থাকে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ভবিষ্যত নিয়ে। নিজে না থাকলে কীভাবে তারা জীবনযাপন করবে, দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবে তা নিয়ে দুর্ভাবনার শেষ থাকে না। একটি ভাল জীবন-বীমা পলিসি এই দুর্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। তাই যতদিন বেঁচে থাকা, ততদিন স্বস্তির সঙ্গেই বাঁচা সম্ভব।

সতর্কতাঃ

জীবন-বীমার সুবিধার অভাব নেই ঠিকই। তবে ভুল জায়গায় জীবন-বীমার পলিসি খুললে বা প্রতারক এজেন্টের কবলে পড়লে দুর্ভোগের শেষ থাকে না। অনেক সময় পলিসিটি বাতিল হয়ে যায় অথবা কাঙ্খিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই পলিসি খোলার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে হবে, তাদের ট্র্যাক রেকর্ড দেখতে হবে। আর ভালো করে পড়ে নিতে হবে বীমা-চুক্তির শর্তগুলো। বীমা-চুক্তির পাশাপাশি প্রিমিয়াম জমা দেয়ার রসিদগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করতে হবে।

জীবন বীমা কর্পোরেশন

জীবন বীমা কর্পোরেশন (জেবিসি) বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা কোম্পানি, যা ১৯৭৩ সালের ১৪ মে ইন্সুরেন্স অ্যাক্ট ১৯৩৮ ও ইন্সুরেন্স রুলস ১৯৫৮ এবং বাংলাদেশ কর্পোরেশন অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জীবন বীমা কর্পোরেশনে চালুকৃত বীমা পরিকল্পনা গুলো হলো:
০১. আজীবন বীমা (লাভসহ)
০২. মেয়াদী বীমা (লাভসহ)
০৩. প্রগতিশীল মেয়াদী বীমা (লাভসহ)
০৪. প্রত্যাশিত মেয়াদী বীমা (লাভসহ)
০৫. বহু কিস্তি বীমা (লাভসহ)
০৬. ম্যারেজ এন্ডাওমেন্ট পলিসি
০৭. যুগ্ম মেয়াদী বীমা
০৮. শিশু নিরাপত্তা বীমা
০৯. দ্বৈত নিরাপত্তা মেয়াদী
১০. পেনশন বীমা
১১. স্বাস্থ্য বীমা
১২. একক প্রিমিয়াম পলিসি (লাভসহ)
১৩. ট্রিপল প্রটেকশন পলিসি
১৪. ওভারসিস এসুরেন্স পলিসি (লাভসহ)
১৫. আজীবন বীমা (লাভ বিহীন)
১৬. মেয়াদী বীমা (লাভ বিহীন)
১৭. প্রত্যাশিত মেয়াদী বীমা (লাভ বিহীন)
১৮. ওভারসিস মেডিক্লেইম পলিসি
১৯. স্ব-নির্ভর বীমা (লাভ বহিীন)
২০. সম্পত্তি কর বীমা (লাভ বিহীন)
২১. ছেলে মেয়েদের শিক্ষা ও বিবাহ বীমা (লাভসহ)
২২. নিশ্চিত বোনাস মেয়াদী বীমা
২৩. মানি ব্যাক টার্ম পলিসি (লাভ বিহীন)
২৪. সাময়িক বীমা (লাভ বিহীন)
২৫. স্ব-নির্ভর বীমা (একক প্রিমিয়াম পলিসি)
২৬. দারিদ্র বিমোচনে জীবন বীমা স্কিম
২৭. প্রবাসী বীমা
২৮. জেবিসি মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম
২৯. জেবিসি প্রত্যাশিত মাসিক সঞ্চয়ী স্কিম
৩০. সামাজিক নিরাপত্তা বীমা (লাভসহ)
৩১. প্রমিলা ডিপিএস (লাভসহ)
৩২. হজ্জ্ব বীমা (লাভসহ)
৩৩. গ্রামীণ জীবন বীমা (লাভসহ)
৩৪. বন্ধকী নিরাপত্তা বীমা (মর্টগেজ প্রটেকশন পলিসি)
লেখক পরিচিতি:
মো: আলাউদ্দীন
ডি এম-১, কোড নং-৪১৩২
৯০৬, নিউমার্কেট শাখা
জেবিসি খুলনা।

Facebook Comments