সেই চারাগাছ এখন বিশাল বৃক্ষ

 ॥ মীর লিয়াকত আলী ॥

কোন শুভ কাজই যায় না বৃথা। জীবনের পরতে পরতে কাল থেকে কালে কথাটি বার বার সত্যে হয়েছে পরিনত। এমনি জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাও। ১৯৮২ সাল থেকে ২০১৮ সময়টা কম নয়। প্রায় চারটি দশক ছুঁই ছুঁই। তখনো অর্থ্যাৎ স্বাধীনতার একটি দশক পার হয়ে গেলেও স্বাধীন দেশে তখনো জাতীয় পর্যায়ে কোন সাংবাদিক সংগঠন জন্মগ্রহন করেনি। সংগঠন যে তিনটি ছিলো তার প্রতিষ্ঠাকাল ছিলো দেশের স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে। এই তিনটি সংগঠন হলো বিএফইউজে, ডিইউজে এবং সাংবাদিক সমিতি। স্বাধীন দেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাই প্রথম জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক সংগঠন।
শুধু তাই নয়,বিএফইউজে দেশের সর্বস্তরের সাংবাদিকদের কোন সংগঠন নয়, ডিইউজে শুধুমাত্র ঢাকায় কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন এবং সাংবাদিক সংস্থা শুধুমাত্র দৈনিক পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতাদের নিয়ে গঠিত সাংবাদিক সংগঠন। দেশে তখন সর্বস্তরের সাংবাদিকদের সংগঠিত করা এবং সাংবাদিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করার জন্য কোন সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হয়নি- সে সময় এতো সাংবাদিকও ছিলো না।
সত্তরের দশকের প্রথম ভাগে দেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে সাংবাদিক সমিতিতে এই সময় আমি ছিলাম দৈনিক আজাদ এর কমলগঞ্জ প্রতিনিধি। সাংবাদিক সমিতির সেই সময়ের সভাপতি সফিউদ্দিনের কাছে আমি প্রস্তাব রাখলাম সাংবাদিকদের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে এবং সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধিতে রেডিও টেলিভিশন সাপ্তাহিক পাক্ষিক মাসিক ইত্যাদির সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সফিউদ্দিন সাহেবও এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে বললেন পর্যায়ক্রমে এটা করা হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। পরে আবারো তাকে বলেছি তার সিলেট সফরের সময়। শফিউদ্দিন ভাই আমার চিন্তাচেতনাকে সমর্থন করলেও লক্ষ্য করলাম তার সাথে থাকা সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটিরই দুএকজন আমাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতেও ছাড়লেন না। তাদের কথার সূত্র ধরে শফিউদ্দিনও এক পর্যায়ে বললেন সংগঠনের নানা ক্রান্তি লগ্ন চলছে, এক্ষুনি এর বিস্তৃতি আমাদের কর্যক্রমকে বিঘ্নিত করবে। সে সময় পত্রিকার সংখ্যাও এখনকার মতো এতো বেশি ছিলো না। ঢাকায় সাংবাদিক সমিতির সম্মেলনেও একই প্রস্তাব আসে কিন্তু কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা সম্ভব হয়নি। তবে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার পর যখন সারা দেশে আলোড়ন তোলে তারও অনেক পর সমিতির নিবেদিত প্রাণ সভাপতি এই শফিউদ্দিন ভাইও জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার একটি আয়োজনে উপস্থিত হয়ে সংস্থার কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে যাই হোক।
১৯৭৪ সালে আমি আমার বাড়ির এলাকায় প্রথম কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব গঠনে উদ্যোগী হই, এটা করা তখনকার যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশে সহজসাধ্য ছিলো না। ১৯৭৬ সালেই কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন আমি ছিলাম সাংবাদিক সমিতির কমলগঞ্জ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। আমার আহ্বানে অনুষ্ঠিত সভায় আমাকে কমলগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং দৈনিক সংবাদের তৎকালীন বার্তা পরিবেশক আলালউদ্দিনকে সম্পাদক মনোনীত করা হয়। এই প্রেসক্লাব করার পর থেকে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অবাধ একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হই। তৃণমূলের স্বল্প অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই আমার মনের স্বপ্ন ডানা মেলতে থাকে। কিন্তু মফস্বলে থেকে তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ছিলো অত্যন্ত দুরুহ একটি কাজ।
পরবর্তীতে ঢাকায় সাংবাদিক সমিতির পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে সেখানেও আমি সর্বস্তরের সাংবাদিকদের সম্পৃক্ত করার পূর্বের আলোচিত বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেও বিফল হই। ঐ সম্মেলন চলাকালীন ঢাকার রাজপথে সাংবাদিক সংস্থার যে মিছিল হয়েছিলো আমি সেই মিছিলে ছিলাম। তখনো আমার ভাবনায় সেই বিষয়টিই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিন করে জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে শেষ হবার কথা ছিলো। এ সময় তোপখানা রোডে ফুটপাত দিয়ে হেটে যাওয়া বন্ধু আলতাফ হোসেনকে কাকতালীয়ভাবে পেয়েই মিছিল থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। অবশ্য আমি সমিতির ডেলিগেট হিসাবে সম্মেলনে অংশ নিতে ঢাকা আসছি তা আগেই আলতাফকে জানিয়েছিলাম। হয়তো পরদিন দেখা হতো, তা হয়ে গেল সেদিনই। বন্ধুর সাথে ফুটপাত দিয়ে হেটে যেতে যেতে এবং পরে রিক্সায় বসে আমি নিজের মনের কথা শেয়ার করলাম তার সাথে। মুহম্মদ আলতাফ হোসেন তখন ডি ইউজের নেতা। দৈনিক আজাদের তিনি সাব-এডিটর। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে তার সাথে আমার ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব। তীক্ষ্নধী সম্পন্ন এই বন্ধুটি সব সময়ই স্বল্পভাষী। তার নিষ্ঠা সত্যাশ্রয় মেধা ও সহিষ্ণুতা ছিলো সর্বদাই ব্যতিক্রমধর্মী। যে কোন কাজে তার যুক্তিপূর্ণ নির্দেশনা ছিলো অকাট্য। আমার পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সহজেই বুঝে ফেললো সে, তার মৃদু হাসি সব সময়ই অর্থপূর্ন। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না আমরা ইনশাল্লাহ সফল হবো। তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহন ও বাস্তবায়নে সে ছিলো সিদ্ধহস্ত। আমার উৎসাহ দেখে সে তখন যা বললো সেখানে বসেই আমার মনে হলো যতো বড় সংগঠনই আমি গড়তে চাই তা যেন খুবই সহজ একটা কাজ। পেয়ে গেলাম আলতাফের পূর্ন সমর্থন! আমি জানতাম তার কথা এবং কাজে অভূতপূর্ব মিল রয়েছে। সেদিন আমরা একসাথে লাঞ্চ করলাম। তার ও আমার সব কাজই আপনাআপনি বাতিল হয়ে গেলো। মনে হলো এই কাজটি ছাড়া আমাদের আর কোন কাজ নেই। আমার কথায় সে তার পূর্ব গৃহিত সব এ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করলো। মূলত: জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কাজ আমরা তখনই শুরু করে দিলাম। একঝাাঁক নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকও আমরা পেয়ে গেলাম।
আমি কমলগঞ্জ থেকে এসে হোটেল ভাড়া করে থাকতে আরম্ভ করলাম। কখনো বোনের বাসায়। হোটেলে বসেই আমাদের পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে থাকলাম। দুজনের সম্মিলিত ভাবনা এগিয়ে চললো। আর্থিক দিকগুলো পরিস্থিতির চাপে আমাকেই সামলাতে হলো। সাপ্তাহিক নবজাগরণের (৫১, উত্তর কমলাপুর) অফিসকেই অফিস হিসাবে ব্যবহার করতে গিয়ে সম্পাদক এডভোকেট আবুল কাসেমের নাম এভাবেই সংস্থার সাথে জড়িয়ে গেলো।
১৯৮১ সালের ১৫ জুলাই আমরা ঢাকায় সাংবাদিক সমাবেশের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারন করলাম। এসময় আমাদের সাথে যুক্ত করলাম আবুল হোসেন, মোস্তফা ইয়াসিন, সুমন মাহবুব, আব্দুস সাত্তার, শাহজাহান মোল্লার মতো পরিশ্রমী কয়েকজন সাংবাদিক যারা রাত দিন আমাদের সঙ্গ দিলেন। পেয়ে গেলাম ওয়াহিদুর রহমান, এম আর মাসুদসহ কয়েকজন নিভৃতচারী নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকদের। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় এই সময় দেশের রাজনৈতিক প্রতিকুলতায় আমাদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলো। রাজনৈতিক পরিস্থিতিছাড়াও কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলো। সে সময় মোবাইলের যুগ ছিলো না। সংগঠনের তড়িৎ সিদ্ধান্ত সবাইকে জানাতে ল্যান্ড ফোন ব্যবহারই ছিলো সমস্যাপূর্ন। ঢাকায় পাওয়া গেলেও মফস্বলে যোগাযোগ ছিলো কষ্টকর। ডাকযোগে চিঠির কোন বিকল্প ছিলো না। অনিবার্য কারন দেখিয়ে আহুত সভা স্থগিত করতে হলো। সাময়িক অসুবিধা কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ২৩ ডিসেম্বর চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করি। ১৯৮২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী তারিখ নির্ধারন করা হয়। সাংবাদিক সমিতি এই খবর জানতে পেরে নানাভাবে আমাদের তীর্যক সমালোচনা করলেও আমরা কোন বাদ প্রতিবাদে সাড়া না দিয়ে নীরবে অক্লান্তভাবে কাজ করে গেলাম। ১২ ফেব্রুয়ারীর বিশাল সাংবাদিক সমাবেশে আমাকে আহ্বায়ক নির্বাচিত করে জাতীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। আমাদের কার্যক্রম এতোই সুসংহত ছিলো যে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) স্বতপ্রনোদিত হয়ে আমাদের সভাটি কাভার করেছিলো, যার কারনে সকল সংবাদপত্রে তা প্রকাশিত হয় এবং দেশব্যাপী এই খবর ছড়িয়ে পড়ে। আলতাফের চেষ্টায় দৈনিক আজাদ আমাদের দারুন যথেষ্ট সহায়তা দেয়। আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেলাম। গঠিত হয় পূর্নাঙ্গ জাতীয় কমিটি। আমার ওপরই অর্পিত হয় সভাপতির গুরু দায়িত্ব। আবুল হোসেনকে মহাসচিব করে জাতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষনা করা হয়। ডি ইউজে করার কারনে আলতাফ নেতৃত্বের পুরোভাগে এলেন না তবে সহ-সভাপতি থাকলেন।
এভাবেই স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় পর্যায়ের বৈষম্যহীন অবাধ সাংবাদিক সংগঠনটি জন্ম লাভ করে। টানা প্রায় এক দশক আমি সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ডিইউজের সাথে না থাকার ফলে আলতাফ একবার মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করে। আমার পর অধ্যক্ষ দেলোয়ার জাহিদ একবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তী সময় থেকে আলতাফ তার চাকুরী শেষে নেতৃত্বের পুরোভাগে চলে আসার পর এখনো নিরলসভাবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছে। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে সাংবাদিক সংস্থা এখন সারা দেশব্যাপী বৃহত্তম সংগঠন হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষনে সক্ষম হয়েছে। আমি সভাপতির পদ ছেড়ে দিলেও আলতাফ আমাকে কোন মূহূর্তই সরে থাকতে দেয়নি। সংগঠনের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে বা কর্মসূচীতে কখনো প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে, কখনো সুপ্রীম কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে, কখনো স্থায়ী পরিষদের প্রধান হিসেবে কিংবা কখনো অন্যতম নীতিনির্ধারক হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব আজোবধি পালনের চেষ্টা করেছি। এক কথায় সে আমাকে সর্বদাই সম্পৃক্ত রাখার ব্যাপারে ছিলো অত্যন্ত আন্তরিক।
আসলে দেশে তখন সাংবাদিকদের মধ্যে কোটারী সিস্টেম মারাত্মক বৈষম্য সবাই অনুভব করলেও সময়োপযোগী পদক্ষেপ না থাকার ফলে একটা নৈরাজ্য বিরাজমান ছিলো। সাংবাদিক সমাজ দেশের আলোকিত সমাজ। এখানে যে কোন বৈষম্য দু:খজনক। বড় ছোট সাংবাদিক বলে কোন ভেদাভেদ সৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের ঐক্যে ফাটল ধরায়। সর্বোপরি দেশে সাংবাদিকদের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। এই সব চিন্তাধারা থেকে দেশব্যাপী সাংবাদিক সংস্থার প্রতি সবাই মনোযোগী হয়। সূক্ষ্ম বুদ্ধি সম্পন্ন আলতাফ এরই মধ্যে সাংবাদিক সংস্থাকে নিবন্ধনকৃত করতে সক্ষম হলে সংগঠন আরো গতিপ্রাপ্ত হয়। এটি আলতাফের বহু পরিশ্রমের ফসল। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেও সংস্থাকে সে পরিচিত করে তোলে গৃহিত বিভিন্ন কর্মসূচী দিয়ে। সাংবাদিকদের সনদ প্রশ্নে প্রেস কাউন্সিলে সাংবাদিক সংস্থার প্রস্তাবনা ছিলো সর্বাগ্রে। আলতাফ এই লেখাটির দায়িত্বও আমার ওপর অর্পন করে। আমার এই লেখাটি যথাসময় প্রেসকাউন্সিলে সাংবাদিক সংস্থার পক্ষে জমা দেয়া হয়।
মুহম্মদ আলতাফ হোসেন নিরলসভাবে সারা দেশ চষে ফিরছে, জেলা উপজেলা এমনকি ইউনিয়নওয়ারীও সে অক্লান্তভাবে সফর করছে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবার মাঝে অনুপ্রেরনা সৃষ্টি হয়েছে। সংগঠনের হাজার হাজার সদস্য তাকে স্বাগত জানাচ্ছে, যা অন্য সংগঠনগুলোতে সচরাচর দেখা যায় না। তাই দৃঢ় আশা করি একদিন সাংবাদিক সংস্থা চারাগাছ ছিলো, সেখান থেকে বিশাল বৃক্ষ হয়েছে, একদিন ইনশাল্লাহ এই বৃক্ষ হয়ে উঠবে মহীরুহ।
মীর লিয়াকত আলী ॥ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা ॥
Facebook Comments