ভারতে যাওয়ার আগে যশোরে দু’রাত ছিল নূর : সহায়তাকারী বাদশা ও মশিউরকে খুঁজছে পুলিশ

downloadযশোর : নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেনকে ভারতে পার করে দেয় বাদশা ও মশিউর নামে যশোরের দুই ব্যক্তি। সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আগে নূর হোসেন মশিউরের বাড়িতে দু’রাত যাপন করেন। পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

ভারত সীমান্তবর্তী যশোরের শার্শা উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত কেরামত মল্লিকের ছেলে বাদশা ফেনসিডিল চোরাচালান সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। একই উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামের সেবাদত হোসেনের ছেলে মশিউর তার সহযোগী। আত্মগোপনে থাকা এই দুই ব্যক্তিসহ আরও কয়েকজনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।

সাত খুনের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ যশোরের শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামের কামাল হোসেন নামে এক ব্যক্তির নাম পায়। সে নারায়ণগঞ্জে নূর হোসেনের দোকানের সাবেক কর্মচারী। পরে কামালকে গ্রেফতারের জন্য নারায়ণগঞ্জ পুলিশ যশোর পুলিশকে রিক্যুইজিশন দেয়। ১৫ মে বিকেলে যশোর ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বেনাপোলের দুর্গাপুর রোডে বাদশার দোকানের সামনে থেকে কামালকে গ্রেফতার করে। ওই রাতেই যশোরে পুলিশ তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নূর হোসেন কীভাবে ভারতে পাড়ি জমায় সে বর্ণনা দেয় কামাল। সে জানায়, ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়রসহ সাতজন অপহৃত হওয়ার পর নূর হোসেন সেখানকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়ে ছিল। কিন্তু ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একের পর এক অপহৃতদের লাশ উদ্ধার হতে থাকায় আর ঝুঁকি নেয়নি নূর হোসেন। পরদিন ১ মে সে যশোর সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেয়। সোজা এসে ওঠে শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামে মশিউরের বাড়িতে। দুই রাত সে ওই বাড়িতে মশিউরের আশ্রয়ে থাকে। ৩ মে সকালে একই গ্রামের কামাল হোসেনকে ফোনে ডেকে পাঠায় মশিউর। এ সময় মশিউর একটি মোটরসাইকেল আনতে বলে কামালকে। কামাল মোটরসাইকেল আনলে নূর হোসেনকে ওই মোটরসাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে রঘুনাথপুর সীমান্তের দিকে চলে যায় মশিউর। পথে সে চোরাচালান সিন্ডিকেট প্রধান বাদশাকে উঠিয়ে নেয়। এই দুই ব্যক্তি মিলে রঘুনাথপুর সীমান্ত দিয়ে নূর হোসেনকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়।

পুলিশ কামাল হোসেনকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে দুই দফা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানেও সে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে।

এদিকে কামাল গ্রেফতার হওয়ার পর পরই আত্মগোপনে চলে যায় ফেনসিডিল চোরাচালান সিন্ডিকেটের প্রধান বাদশা ও তার সহযোগী মশিউর। পুলিশ তাদের এখনও হদিস মেলাতে পারেনি। তবে এ দুজনসহ আরও বেশ কয়েকজনকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ।

জানতে চাইলে বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, ‘বাদশাকে চিনি। আগে সে ব্ল্যাক (চোরাচালান) করত। এখন বেনাপোলের দুর্গাপুর মোড়ে দোকান নিয়ে ইলেকট্রনিক্সের ব্যবসা করে।’

বর্তমানে বাদশা কোথায় আছে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘আমি জানি না।’ অন্য প্রশ্নের জবাবে মেয়র লিটন বলেন, ‘শ্যামলাগাছি গ্রামের মশিউর নামে কাউকে আমি চিনি না।’

তবে শার্শা-বেনাপোল এলাকার বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, এই সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় ফেনসিডিল চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে বাদশার পরিচালনাধীন সিন্ডিকেট সবচেয়ে বড়। নারায়ণগঞ্জে নূর হোসেনের কাছে যে ফেনসিডিল যেত বাদশার সিন্ডিকেটই তার যোগানদাতা। সিন্ডিকেটটির অনেক সদস্যের মধ্যে মশিউর একজন। ফেনসিডিল বিকিকিনির সূত্র ধরেই নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনের সঙ্গে এদের যোগাযোগ। গ্রেফতার কামাল হোসেন এ সব তথ্যও পুলিশকে দিয়েছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অপূর্ব হাসান বলেন, ‘আমি মাত্র ১ মাস হল এখানে যোগদান করেছি। সে কারণে সবাইকে এখনও চিনে উঠতে পারিনি। তবে বাদশা এলাকায় মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত। সে আত্মগোপনে আছে। পুলিশ তাকে ধরার চেষ্টা করছে।’

শ্যামলাগাছি গ্রামের মশিউর সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘ওই গ্রাম আমার থানার মধ্যে নয়, শার্শার অন্তর্গত। আমি মশিউরের নামও শুনেছি। যতদূর শুনেছি, সেও ভালো লোক নয়।’

জানতে চাইলে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমি যতদূর জানতে পেরেছি, বাদশা বড় মাপের চোরাকারবারি। সে একটি ফেনসিডিল চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক। ভারতেও তার বাড়ি আছে বলে শুনেছি।’

অন্যদিকে ১৫ মে গ্রেফতার হওয়া শ্যামলাগাছি গ্রামের কামাল হোসেনের স্ত্রী হেনা বেগম জানান, তার স্বামী নারায়ণগঞ্জে নূর হোসেনের দোকানের কর্মচারী ছিল। দুই মাস আগে সে চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কামাল হোসেন গ্রামে ফিরে বাদশার ফেনসিডিল চোরাচালান সিন্ডিকেটে যোগ দেয়। পুলিশ তাকে বাদশার দোকানের সামনে থেকে গ্রেফতার করেছিল।

Facebook Comments