কক্সবাজারে বৈশাখের তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে লোডশেডিং যন্ত্রণা

downloadএম.আমান উল্লাহ, কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলায় গরমের ভয়াবহ তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। জেলার, পর্যটন শহর বা গ্রামের কোথাও রেহাই নেই লোডশেডিং যন্ত্রণা। গতকাল দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে গ্রামসহ কক্সবাজারের শহর বাসিকে। দফায় দফায় বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। গ্রামে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের মাঝে নেমে এসেছে জীবদশা। তার সাথে পাল্লা দিয়ে অফিস-আদালতের কার্যক্রমেরও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
তাপমাত্রার পাশাপাশি যখন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা, তখন সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে ভিন্ন কথা। তারা দাবি করেছেন, এ পর্যন্ত কোন লোডশেডিং হয়নি। কক্সবাজার জেলার চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। তবে কক্সবাজারসহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকার কারণ সম্পর্কে তারা বলেছেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের লোড বেড়ে গেছে। এ কারণে বর্তমান বিদ্যুৎ বিতরণের যে সিস্টেম রয়েছে তা দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি তাপমাত্রার কারণে ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুতের সাবস্টেশন গরম হয়ে ভেতরে কয়েল পুড়ে যাচ্ছে। লোড কমানোর জন্য মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার পিডিবির অফিসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা যতই বাড়িয়ে দেখানো হোক না কেন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা মোটেও সম্ভব নয়। ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট আমদানিসহ বর্তমানে বিদ্যুৎতের স্থাপিত ক্ষমতা দেখানো হচ্ছে ১০ হাজার ৩৪১ মেগাওয়াট। আর উৎপাদন ক্ষমতা দেখানো হয়েছে ৯ হাজার ৭২৭ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে সাত হাজার মেগাওয়াটের ওপরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা মোটেও সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ বিভাগের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কক্সবাজারে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ছাড়া বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা থেকে সহসাই মুক্তি মিলবে না কক্সবাজার জেলাবাসীর।
এ দিকে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। এ সময়টাকে পিক আওয়ার ধরে সর্বোচ্চ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাত ১১টার পর থেকে বিদ্যুৎতের চাহিদা কমতে থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎতের লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে না। বরং দিন দিন এখন বাড়ছে। আজকাল মধ্য রাতেও লোডশেডিং করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দিন শুরু হচ্ছে লোডশেডিং দিয়ে। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ থাকছে না জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে। খোদ কক্সবাজার জেলাতেই লোডশেডিংয়ের এ অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রামের কথা তো বলাই বাহুল্য। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে কক্সবাজার পর্যটন নগরবাসী। লোডশেডিংয়ের কারণে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ফ্রিজে রাখা মাছ, গোশত, তরিতরকারি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎতের করণে ঠিক মতো মোটর চালাতে না পেরে অনেক এলাকায় পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। গতকাল কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন করে গ্রাহকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ প্রতিবেদকের কাছে। হাশেমিয়া মাদ্রারাসা এলাকা থেকে সৌদি প্রবাসি নুর উদ্দিন জাসেদ জানিয়েছেন, এলাকা যেন অগ্নিগর্ভ। প্রতি ঘণ্টা পরপর বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়। আর স্থায়ী হচ্ছে এক ঘণ্টা। অর্থাৎ এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এ দিকে তীব্র গরম, আর বিদ্যুৎ না থাকায় আমার পরিবার পরিজনসহ এলাকাবাসি অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎতের লোডশেডিং করায় আইপিএসের চার্জও থাকছে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর বৈদ্যুতিক পাখা কিছুক্ষণ চালু থেকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জাসেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সরকারের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে উন্নয়নের দাবি বাস্তবে তারা দেখতে পারছেন না। অথচ তারা এক হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল চার হাজার টাকা গুনছেন। দক্ষিণ কলাতী থেকে ডা: মুজিবুর রহমান সোহেল জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। লোডশেডিং স্থায়ী হচ্ছে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। সারা দিনে এদিক সেদিক কাটানো যায়। কিন্তু রাতে তো বাইরে বের হওয়া যায় না। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ঘরে থাকাও দায় হয়ে যায়। এর পাশাপাশি, মশার উপদ্রবতো রয়েছেই। সব মিলে টিকাই দায় হয়ে পড়েছে। কলাতলীর আর্দশ গ্রাম থেকে কাজী মৌলানা রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সারা দিনের লোডশেডিংয়ের মাত্রা বোঝা যায় না। কারণ, অফিস চলাকালীন লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানো হয়। কিন্তু বাসায় গেলে বোঝা যায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা। তিনি জানান, গ্রীষ্মের উত্তাপ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তাদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। গরমে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
কক্সবাজার জেলার মহেশ খালী, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফের সব এলাকায়ই একই অবস্থা। চন্দ্রিমার মৃত আব্দুল করিমের ছেলে আব্দুল কায়ুম চৌধুরি জানিয়েছেন, একে তো ভ্যাপসা গরম, এর ওপর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা তরিতরকারী, মাছ, গোশত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানির মোটর চালানো যাচ্ছে না। এর ফলে পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
কক্সবারে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের এফসিএন জানিয়েছেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অধিক চাহিদা মেটাতে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহের ফলে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের জন্য যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় বলে সেগুলোকে ঠান্ডা করতে কিছু সময় বন্ধ করে রাখতে হয়। তবে তিনি বলেন, উৎপাদনের কোনো ঘাটতি ছিল না। অন্য এক কর্মকর্তা জানান, তাপমাত্রা না কমলে বিদ্যুতের এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেই সমস্যা কেটে যাবে।

Facebook Comments