মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক : বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির সরকার প্রদত্ত সিস্টেম নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হ্যাঁ বা না সাড়া না পাওয়ায় আদৌ কর্মী পাঠাতে পারবে কি-না নিশ্চিত নয়। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর কুয়ালালামপুরে উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যে আশায় যুবকেরা বুক বেঁধেছিলো তা যেন ক্রমশঃ হতাশা ও নিরাশায় পর্যবসিত হচ্ছে!

এদিকে কর্মী নিয়োগ ইস্যুতে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে গমন অন্যরকম বার্তা দিচ্ছে। এতে শঙ্কিত শ্রম মার্কেটের বিনিয়োগকারীরা। তারা দ্রুত এ সমস্যা সমাধান করতে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছে। তারা এবং অভিবাসনপ্রত্যাশী যুবক ও তাদের পরিবার সুদূর বাংলাদেশ থেকে ফোন করে জানতে চাচ্ছে কবে লোক নেবে মালয়েশিয়া?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জি-টু-জি প্লাসের সময় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের ইস্যুটি খোদ মাহাথির সরকার উত্থাপন করে পূর্ববতী সরকারের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করার প্রয়াস নেয়। কিন্তু মাহাথির সরকারের মন্ত্রী সে দেশের পার্লামেন্টে ঘোষণা করে যে সিস্টেম কোনো সমস্যা নেই এবং কোনো দুর্নীতি পায়নি।

অন্যদিকে জি-টু-জি প্লাস চুক্তির অধীনে আসা কর্মীদের কাজ না পাওয়ার ঢালাও কোনো ঘটনা নেই যা ২০০৬/০৭ সালে ঘটেছিল। মালয়েশিয়ায় কিছু এনজিও অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে (নেপাল, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ইত্যাদি) জরিপ করে কর্মীদের অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের প্রসঙ্গ উঠে আসে। এটিকে ফোর্স লেবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরপর আন্তর্জাতিক অঙ্গন সোচ্চার হয়।

বাংলাদেশের হাইকোর্টে একটি রিট করে বলা হয়, সরকার ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে মনোপলি করেছে এবং অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সির অধিকার খর্ব করেছে। অপরদিকে বিএমইটি বলেছে, জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের তিন শতাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ করেছে!

হাইকোর্টের রিটের জবাব দিতে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি করে সে কমিটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়া সরকার থেকে নির্ধারিত। তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দশটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রত্যেকটির সঙ্গে ২০টি করে আরও দুইশ রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ে কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এ কনসোর্টিয়াম দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

একইভাবে এবারও মালয়েশিয়া ১০টা থেকে বাড়িয়ে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশ থেকে এর সঙ্গে দশটি করে ২৫০টি রিক্রুটিং এজেন্সি যুক্ত করার প্রস্তাব দেয় যা সর্বশেষ মালয়েশিয়া সরকার রাজি হয়েছে। অর্থাৎ উভয় সরকার রাজি হলেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে সিস্টেম নিয়ে।

মাহাথির সরকার সিস্টেম স্থগিত করেছিল সেই মাহাথির সরকার সিস্টেমের কোনো গলদ নেই মর্মে ঘোষণা করে। ফলে বর্তমান মালয়েশিয়া সরকার সেই সিস্টেমই প্রয়োগ করতে প্রস্তুত এবং বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছে। সিস্টেম সম্পর্কে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় আশঙ্কা রয়েছে যে গত বারের মতো এবারও হঠাৎ করে মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া হবে কি-না, মার্কেট বন্ধ করলে এরই মধ্যে শ্রম বাজারে বিনিয়োগ করা অর্থের কি হবে এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে কি-না?

মালয়েশিয়ার প্ল্যান্টেশন অ্যাসোসিয়েশন এরই মধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে,কর্মী নিয়োগের সব খরচ তারা বহন করবে কিন্তু বাংলাদেশে কর্মীর অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন করতে হবে না এ নিশ্চয়তা কে দেবে? আবার সেই কর্মী মালয়েশিয়ায় এসে অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ দেবে না তার নিশ্চয়তা কি?

এদিকে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির নানান জোট বা সিন্ডিকেট ব্যানার ফেস্টুন টানিয়ে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ে বক্তব্য, বিবৃতি, প্রতিবাদ, স্মারকলিপি ইত্যাদি দিলেও কোনো পক্ষ বা এজেন্সি কত কম খরচে কর্মী প্রেরণ করবে তার কোনো স্পষ্ট ঘোষণা বা পরিকল্পনা পেশ করেনি। নিজেরা নানান জোট করে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও সেই সিন্ডিকেট যেন নিজেরাই গঠন করেছে!

মন্ত্রী বলেছেন, এজেন্সি দেখছে তার ব্যবসার স্বার্থ, আমি দেখব দেশ ও কর্মীর স্বার্থ। তবে এত দিনেও কোনো সমাধান না আসায় এসব মিলিয়ে মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট প্রক্রিয়া ও খরচের সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি। এতে অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেছে। ব্রিটিশ আমল থেকে বিদেশে কর্মী প্রেরণে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বিএমইটি এ বিষয়ে কোনো উপযুক্ত সমাধান নিয়েও এগিয়ে আসেনি। ফলে হতাশা আরও বেড়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বলছে, যারা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল তারা আর অপেক্ষা করতে রাজি না কারণ বয়স বেড়ে যাচ্ছে, তাই এখন অন্যকোনো দেশে যেতে চাপ দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম কবে শুরু হবে বা কবে থেকে কর্মী যাবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ওপর।

সূত্র আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার দিক থেকে সবকিছু দ্রুত ও সাবলীলভাবে এগোলেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়াকে একটি চিঠি দেয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, মালয়েশিয়া কর্মী নিয়োগের জন্য যে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তাতে যেন বাংলাদেশকে যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, কিন্তু এ বিষয়ে আপত্তি রয়েছে মালয়েশিয়ার। দেশটি কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ ১৪টি দেশের সঙ্গে বিদ্যমান প্রক্রিয়ার মতোই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে চায়।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার সবকিছু স্বাভাবিকভাবে শুরু হলে আগামী দুই বছরে অন্তত পাঁচ লাখ কর্মীর মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর সুযোগ হবে। এছাড়া অভিবাসন ব্যয়ও আগের তুলনায় কমিয়ে আনার চিন্তা-ভাবনা চলছে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সরকার আন্তরিক। এ লক্ষ্যে কারিগরি বিষয়গুলো নির্ধারণে কাজ চলছে। কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কত হবে, ডাটা ব্যাংকে নিবন্ধন করা প্রয়োজন কি-না, প্রয়োজন হলে কবে থেকে চালু হবে, বাংলাদেশে একটি অনলাইন পদ্ধতি চালু করা ও মালয়েশিয়া সরকারের কেন্দ্রীয় অনলাইন পদ্ধতির সঙ্গে এই পদ্ধতি কীভাবে যুক্ত হবে- এ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে। তবে কোনো বিষয়েই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।