মানি এক্সচেঞ্জারে অনিয়ম, হার্ডলাইনে বাংলাদেশ ব্যাংক

মানি এক্সচেঞ্জারে অনিয়ম, হার্ডলাইনে বাংলাদেশ ব্যাংক

bbঅর্থনীতি ডেস্কঃ fহুন্ডিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে একের পর এক মানি এক্সচেঞ্জারের লাইসেন্স বাতিল করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বর্তমানে দেশে মানি এক্সচেঞ্জারের সংখ্যা দাড়িয়েছে ২৩৪ টি। অথচ একসময় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ছয় শতাধিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সঠিকভাবে হিসাব সংরক্ষণ না করা, অননুমোদিত লেনদেন, হুন্ডিতে টাকা পাচারসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ায় এ পর্যন্ত ৬১ শতাংশ মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
তবে মানি এক্সচেঞ্জারের মালিকরা উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, বৈধ লেনদেন চালু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের কোন সহযোগিতা করছে না।
১৯৯৭ সাল থেকে দেশে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স প্রদান শুরু হয়। প্রায় চার বছর ধরে গণহারে লাইসেন্স প্রদানের ফলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যায়। লাইসেন্স পেয়ে মানি এক্সচেঞ্জারগুলো ব্যাপক হারে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন শুরু করলেও অভিযোগ ওঠে, এসব লেনদেনের বেশিরভাগই অবৈধ। এরপর থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মানি এক্সচেঞ্জারের লাইসেন্স বাতিল করা শুরু হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাইসেন্স দেয়ার পর থেকেই তারা আগের চেয়ে বেশি বেপরোয়া হতে শুরু করে। আগে রাস্তায় যেটা করতো সে সব কাজ লাইসেন্স সামনে নিয়ে করতে শুরু করে। আমরা তাদের কোনভাবেই যখন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না তখনই তাদের অপরাধের ওপর ভিত্তি করে ক্রমান্বয়ে লাইসেন্স বাতিল করা শুরু করেছি।
তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৬১ শতাংশ মানি এক্সচেঞ্জারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে লাইসেন্সধারী মানি এক্সচেঞ্জারের সংখ্যা ২৩৪ এসে ঠেকেছে । এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই আবার কোর্টের স্থগিতাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের সঠিক হিসেব সংরক্ষণ করে না। যখন হিসেবের বিবরণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়, তখন তারা প্রতিদিনের লেনদেন হিসেবে যতসামান্য উল্লেখ করা শুরু করে। কিন্তু অভিযানে গিয়ে দেখা গেছে ড্রয়ার ভর্তি ডলার। একইসাথে অনুমোদন ছাড়াই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে শাখা স্থাপন করেছে।
অনিয়মের অভিযোগে লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে জানতে চাইলে মানি এক্সচেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোস্তাফা খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকই আমাদের সহযোগিতা করছে না। লাইসেন্স দেয়ার আগে অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেয়ার জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সেটা না করেই লাইসেন্স দিয়েছে, আবার এখন বাতিল করছে।
তিনি বলেন, অনিয়ম বন্ধে আমরা কঠিন তদারকির জন্য বলেছিলাম। কিন্তু সেটা না করে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। হুন্ডির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু হুন্ডি যারা করছে তাদের ধরছে না্। ইন্সপেকশন করতে বলেছিলাম কিন্তু সেটাও করা হচ্ছে না।
এদিকে গত নভেম্বর থেকে মানি এক্সচেঞ্জারের লেনদেনের সকল হিসাব অনলাইনে সম্পাদন করার নির্দেশনা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তিতে সময় ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়া হয়। একই সাথে অর্থ পাচার রোধে এসব প্রতিষ্ঠানকে রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিফআইইউ।
বাংলাদেশ বাংকের এ তদারক শাখার পক্ষ থেকে জারিকৃত সার্কুলারে বলা হয়েছে, মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব স্থানীয় মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি দৈনিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এই রেজিস্টারের হিসাবের বাইরে কোন বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা যাবে না। লেনদেনের উদ্দেশ্যে আসা গ্রাহক ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বৈদেশিক মুদ্রা সহকারে অবস্থান করতে পারবে না। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোথাও বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় বিক্রয় করতে পারবে না। সিটি কর্পোরেশনে অবস্থিত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসাকেন্দ্রে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করবে এবং রেকর্ডকৃত ভিডিও ন্যূনতম সাত দিন সংরক্ষণ করতে হবে। যদি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত (পলিটিক্যালি এক্সপোজড পারসনস- পিইপি‘স) কোন ব্যক্তি লেনদেনে করতে আসে তবে তার লেনদেন অবশ্যই প্রধান নির্বাহীর অনুমোদন সাপেক্ষে করতে হবে। তাদের সঙ্গে সংঘটিত লেনদেন মনিটর করে কোন অসংগতি পেলে তা বিএফআইইউকে জানাতে হবে। প্রভাবশালী কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কাজ করতে বলা হয়েছে। ব্যাংক সুত্র জানিয়েছে, মানি এক্সচেঞ্জারের অনিয়ম ঠেকাতে আরও কঠোর হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভবিষ্যতেও্ লাইসেন্স বাতিল অব্যাহত থাকবে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা সব মানি এক্সচেঞ্জারগুলোকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর ভিতর আনতে চেষ্টা করেছিলাম। যারা আসতে পারেনি ও নিয়ম লঙ্ঘন করেছে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও যারা নিয়ম বহির্ভূত কাজ করবে তাদেরকেও এই শাস্তির আওতায় আনা হবে।
অবশ্য মোস্তাফার দাবি, লাইসেন্স বাতিল করলেও মানি এক্সচেঞ্জারে অনিয়ম বন্ধ হয় না। বরং তা বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা অদল-বদলে অপেক্ষাকৃত বেশি দাম দেয়ার কারণে মানুষ মানি এক্সচেঞ্জারে যায়। অসাধু ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা হয়তো অপব্যবহার করছে। লাইসেন্স বাতিল হলে ভালো ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়বেন। এতে প্রকৃতপক্ষে সবার ক্ষতি হবে।

Leave a Reply