মশা মারতে কতটা সফল ডিএনসিসির ‘আনাড়ি কর্মীরা’

নিজস্ব প্রতিবেদক : এডিস মশা নির্মূলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) চলমান ‘এডিস মশা ধ্বংসকরণ ও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ অর্থাৎ ‘চিরুনি অভিযান’ পরিচালিত হচ্ছে।

গত ২৫ আগস্ট থেকে গত ১২ দিনে ৩৬টি ওয়ার্ডে সর্বমোট ১ লাখ ২১ হাজার ৫৬০টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে মোট ১ হাজার ৯৫৭টি বাড়ি ও স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পেয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। এ ছাড়া ৬৭ হাজার ৩০৬টি বাড়ি ও স্থাপনায় এডিস মশার বংশবিস্তার উপযোগী স্থান-জমে থাকা পানি পাওয়া গেছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। কিন্তু সংস্থাটির নেই পর্যাপ্ত লোকবল। পাশাপাশি ফগার ও হুইলব্যারোসহ অন্যান্য মেশিন- যন্ত্রপাতিতে সংকট থাকায় মশা নিধন পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে প্রতিটি সেবা-সংক্রান্ত কার্যক্রমেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

চারদিকে এখনও ডেঙ্গু আতঙ্ক। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নতুন নতুন রোগী। এ অবস্থায় ডেঙ্গু মোকাবিলাসহ মশক নিধনে এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে ডিএনসিসি। এরমধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মশকনিধন এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে কিছু সংখ্যক নতুন কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে এসব কর্মীর বেশির ভাগই কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু করায় তাদের আলাদা করে প্রশিক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা করতে পারেনি সংস্থাটি।

উত্তর সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ৫৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ৩০ জন করে নতুন কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করবেন তারা। এ জন্য সংস্থাটির স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের কাছে। ডিএনসিসিতে ৫৪টি ওয়ার্ডে ৩০ জন করে ১ হাজার ৬২০ জন নতুন কর্মী নিয়োগ দেয়ার কথা। এসব কর্মীদের দৈনিক হাজিরা হবে ৪৭৫ টাকা করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বর্তমানে দায়িত্বপালন করা একাধিক মশক নিধন কর্মী বলেন, সব ওয়ার্ডে ৩০ জন নতুন মশক নিধন কর্মী নিয়োগ দেয়া এখনও সম্ভব হয়নি। তবে যাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তারা এ কাজে একেবারেই অনভিজ্ঞ। ডেঙ্গু যে পরিস্থিতি এতে করে লোক নিয়োগ দেয়া অবশ্যই উচিত কিন্তু এ আনাড়ি কর্মীরা মশক নিধনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রম কোনো সহজ কাজ নয়, এখানে অভিজ্ঞরাই হিমশিম খায়। এ অবস্থায় কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া নতুন এসব মশক নিধন কর্মীরা কতটা কাজ করতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।

জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান বলেন, ‘মশক নিধনসহ পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা সার্বিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই। তবে আমাদের জনবল সংকট রয়েছে, এত বড় এলাকার জন্য এত কম জনবল দিয়ে সব কাজ করানো আসলেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমার ওয়ার্ডে যে কয়জন মশক নিধন কর্মী আছে তাদের দিয়ে পুরোপুরি মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ জন্যই নতুন আরও মশক নিধন কর্মী প্রয়োজন।’

আরেক কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা সবাই একসঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। নতুন যেগুলো মশক নিধন কর্মী নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সেগুলো অনভিজ্ঞ এটা ঠিক। তবে তাদের অনেকেই আগে চুক্তি ভিত্তিক পরিচ্ছন্নতার কাজ করেছে। প্রয়োজনে তাদের আরও প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। কারণ আমাদের বর্তমানে যে সংখ্যক মশক নিধন কর্মী আছে তা দিয়ে পুরোপুরি কাজ করানো সম্ভব নয়, সে কারণে অনভিজ্ঞ হলেও নতুন করে মশক নিধন কর্মী নিয়োগ দেয়া জরুরি।’

এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৩০৫৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে ডিএনসিসি। গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত নগর ভবনে এ বাজেট ঘোষণা করেন মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। নতুন বাজেটে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ থেকে ১৮২ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে শহরের প্রতিটি অলিগলি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সংস্থাটি। সম্প্রতি কলকাতার পৌর সংস্থার ডেপুটি মেয়রের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আলোচনা করেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। যার ধারাবাহিকতায় কলকাতার মতো তিন স্তরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছে সংস্থাটি।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী সারাবছরই সব অলিগলি ও জনবহুল স্থানে নিয়মিতই পরিচালিত হবে মশক নিধন কর্মসূচি।

মশক নিধনে গতানুগতিক পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। মশক নিধন কর্মীরা সাধারণত পিঠে মশক নিধন ওষুধের সিলিন্ডার বহন করে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করেন। এটি একদিকে সময় সাপেক্ষ, অন্যদিকে শ্রমসাধ্য ব্যাপার।

যে কারণে সম্প্রতি মেয়র আতিকুল ইসলামের উদ্যোগে মোটরসাইকেলে মশক নিধনযন্ত্র স্থাপন করে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি অঞ্চলের প্রতিটিতে একটি করে মোটরসাইকেল কাম মশকনিধনযন্ত্র দেয়া হয়। প্রতিটি মোটরসাইকেলে দু’জন কর্মী থাকবেন। একজন চালাবেন, অন্যজন পেছনে বসে মশার ওষুধ প্রয়োগ করবেন। প্রতিটি মোটরসাইকেলে ঘণ্টায় প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে।