নবিজীর (সা.) গুণে মুগ্ধ হয়ে কালেমা পড়লেন রাবাই

নবিজীর (সা.) গুণে মুগ্ধ হয়ে কালেমা পড়লেন রাবাই

ইসলাম ডেস্ক : ইসলাম পৃথিবীর সেরা জীবন ব্যবস্থার নাম। এ জীবন ব্যবস্থার সব আচার-আচরণই সুন্দর এবং উত্তম। নবিজীর যুগে মদিনার বিখ্যাত ইহুদি পণ্ডিত রাবাই-এর বর্ণনায় তা ফুটে ওঠেছে। সর্বশেষ নবি ও রাসুল তাঁর গুণাবলীতে কেমন হবেন, এ সবই তার জানা ছিল। তার জানা সব গুণগুলো সত্য প্রমাণিত হওয়ার পরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন। বিখ্যাত এ ইহুদি পন্ডিত ‘রাবাই’ ইসলাম গ্রহণ করার পর নাম রাখেন- ‘যায়িদ ইবনে সুনাহ’।

নবিজীর ঋণ গ্রহণ

একজন সাহাবির প্রয়োজনে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ইহুদির কাছ থেকে ঋণ নেন। ঋণ নেওয়ার বিধান হলো- ঋণ ফেরত দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদিকে একটি তারিখ দিলেন, যে তারিখে তিনি ঋণ ফেরত দেবেন।

একদিন নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে নিয়ে একটি জানাযা থেকে ফিরছেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু বকর, ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতো মহান সাহাবি। ঠিক সেই সময় ওই ইহুদি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গলার চাদরে ধরে রাগতস্বরে, অভদ্র ভাষায় বললো-

‘হে মুহাম্মদ! আমার কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিলে, সেই অর্থ কোথায়? আমি তো তোমার পরিবারকে চিনি। ঋণ নিলে তোমাদের আর (ফেরত দেওয়ার) কোনো খবর থাকে না!’

কী আশ্চর্যের কথা! মদিনার রাষ্ট্র প্রধান। যার কথায় নিজেদের জীবন দিতে প্রস্তুত সাহাবিরা। যারা নবিজীর সামান্য ইশারা পেলেই উড়িয়ে দিতে পারে ইহুদির গর্দান। তাঁকে সবার সামনে এতো বড়ো অপমান করা হলো? অথচ ঋণ পরিশোধের যে তারিখ নির্ধারিত হয়েছিলো, সেটাও এখনো বাকি। সময়ের আগেই সুন্দরভাবে ঋণ ফেরত না চেয়ে এভাবে অভদ্র ভাষায় দাবি করতে হবে?

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যেমন ক্ষমতা ছিলো, তেমনি তিনি ছিলেন ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী। ইহুদির অমার্জিত আচরণকে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। ইহুদিরা তাঁকে নবি হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও মদিনা সনদের আলোকে তারা তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধান বিচারক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদিকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখেন।

হজরত ওমরের প্রতিক্রিয়া

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বিষয়টি সহ্য করতে পারেনি। তিনি তাঁর স্বভাবজাত সেই বিখ্যাত উক্তিটি বললেন- ‘হে রাসুল! আপনি অনুমতি দিন, তার গলা থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলি।’

নবিজীর নসিহত ও শিক্ষা

নবিজী এ কথা শুনে উল্টো হজরত ওমরকে বললেন- ‘ওমর! তোমার কাছ থেকে তো উত্তম আচরণ আশা করা যায়। তুমি এভাবে না বলে বরং আমাকে বলতে পারতে- ‘আপনি তাঁর (ইহুদির) ঋণ পরিশোধ করুন’। কিংবা তাকে (ইহুদিকে) বলতে পারতে- আপনি সুন্দরভাবে ঋণের কথা বলতে পারতেন।’

অসুন্দর কথার জবাব সুন্দর আচরণ দ্বারা এবং অনুত্তমের (মন্দ কাজের) জবাব কীভাবে উত্তম দ্বারা দিতে হয় সেটা নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত ওমরসহ উপস্থিত সাহাবিদের শেখালেন।

নবিজীর গুণ ও ফয়সালা

এরপর নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিলেন, ‘হে ওমর! যাও, তার সঙ্গে এবং তাকে তার ঋণ পরিশোধের পর আরো ২০ সা’ খেজুর দিয়ে দাও। কারণ, তুমি তাকে ভয় দেখিয়েছো।’

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইহুদিকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। তাকে তার প্রাপ্য ঋণ প্রদান করলেন এবং সঙ্গে আরো ৩২ কেজির মতো খেজুর দিলেন। ঋণ পরিশোধ করার পরও অতিরিক্ত খেজুর দেখে ইহুদি অবাক! কারণ প্রথমত সে সময়ের আগেই পাওনা দাবি করেছে, তার ওপর সবার সামনে নবিজীকে অপমান করেছে; তবুও নবিজী তাকে পাওনা দিয়ে দিলেন, সঙ্গে দিচ্ছেন অতিরিক্ত আরো ৩২ কেজি খেজুর!

সে (ইহুদি) জিজ্ঞাসা করলো, ‘অতিরিক্ত খেজুর কেন?’

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘কারণ, আমি তোমাকে হুমকি দিয়েছি। সেটার কাফফারা হিসেবে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো দিতে বললেন।’

ইহুদির পরিচয়

হজরত ওমরের কথা শুনে ইহুদি বললো, ‘ওমর, তুমি কি জানো আমি কে?’

ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘না, আমি জানি না। তুমি কে?’

এবার ইহুদি বললো, ‘আমি যায়িদ ইবনে সুনাহ।’

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নাম শুনেই (চক্ষু চড়কগাছ!) অবাক! যায়িদ ইবনে সুনাহ? মদিনার সেই বিখ্যাত ইহুদি (আলেম) রাবাই?

হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নাম জানতেন, কিন্তু তিনিই যে ঐ ব্যক্তি, সেটা তিনি জানতেন না। যায়িদ ইবনে সুনাহ বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই সেই ইহুদি রাবাই।

ইহুদি ‘রাবাই’র পরীক্ষা

ইহুদি পন্ডিত রাবাই বললেন, ‘আমাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবি হওয়ার প্রমাণের যতো ভবিষ্যৎবাণী পাওয়া যায়, সবগুলোই আমি তাঁর মধ্যে পেয়েছি। শুধু দুটো বিষয় (গুণ) পরীক্ষা করা বাকি ছিলো। সেই দুটি গুণ ছিলো-

১. তাঁকে কেউ রাগালে তিনি সহনশীলতা দেখাবেন।

২. কোনো মূর্খ তাঁর কাছে এসে মূর্খের মতো আচরণ করলে তিনি বরং সেই মূর্খের সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। অর্থাৎ তিনি মন্দের জবাব ভালোর মাধ্যমে দেবেন, অনুত্তমের জবাব উত্তমের মাধ্যমে দেবেন।

যায়িদ ইবনে সুনাহ নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে সেই দুটো গুণও এবার দেখতে পান। তিনি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রাগানো সত্ত্বেও তিনি তার সঙ্গে রাগ করেননি; উল্টো তার পাওনা অর্থের বেশি তাকে দিয়েছেন।

ইহুদি ‘রাবাই’র ইসলাম গ্রহণ

এবার যায়িদ ইবনে সুনাহ বললেন, ‘হে ওমর! তুমি সাক্ষী থাকো- আমি আল্লাহকে আমার রব হিসেবে, ইসলামকে আমার ধর্ম (জীবন ব্যবস্থা) হিসেবে এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমার নবি হিসেবে মেনে নিলাম। আমার অনেক সম্পদ আছে। আমি আমার অর্ধেক সম্পদ ইসলামের জন্য দান করে দিলাম।’

তথ্য সূত্র : ইবনে হিব্বান, বায়হাকি, মুসতাদরাকে হাকেম।