ঠান্ডা মাথার ‘ফিনিশার’ আকবর আলি

স্পোর্টস ডেস্ক : পচেফস্ট্রমের সেনওয়েজ পার্কে ভারতীয় যুব দলের বোলারদের সামনে মুখ থুবড়েই পড়তে যাচ্ছিল বাংলাদেশের ব্যাটিং। ১৭৮ রানের লক্ষ্য। সেখানে ১৪৩ রানেই শেষ ৭ উইকেট। উইকেটের যে অবস্থা আর ভারতীয় বোলারদের যে আগ্রাসন, তাতে বাকি তিন উইকেট হাওয়া হয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়।

সেই মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থা থেকে ধৈর্য্যের পর্বত তৈরি করে দিলেন অধিনায়ক আকবর আলি। হাতে প্রচুর বল রয়েছে। রীতিমত টেস্ট মেজাজে খেলা শুরু করে দিলেন। মাঝে ৩১ বলে তো কোনো রানই নিলেন না ভারতীয় বোলারদের কাছ থেকে। রানের চাকা থমকে দাঁড়িয়েছিল, তার টেস্ট ইনিংস দেখে।

কিন্তু ধৈর্য্যের পর্বত রচনা করে আকবর আলি শুধু চেয়েছেন দলকে বিজয়ের বন্দরে নোঙ্গর ফেলাতে। কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যথার্থ নেতার মত দায়িত্ব পালন করলেন। স্নায়ুর চাপের কঠিন পরীক্ষা দিলেন। ভারতীয় বোলারদের ক্রমাগত চাপ সামলে আকবর আলি দলকে ঠিকই পৌঁছে দিলেন মনজিলে মকসুদে।

ভারতের মত শক্তিশালী দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ হয়ে গেলো নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। হোক না সেটা অনুর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট। কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তো! বৈশ্বিক কোনো টুর্নামেন্টে এটাই যে প্রথম বাংলাদেশের কোনো বিশ্বজয়। তা সম্ভব হয়েছে অসাধারণ ‘ঠাণ্ডা’ মাথার ক্রিকেটার আকবর আলির চরম ধৈর্য্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে।

একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে কাংখিত সাফল্যে পৌঁছে দেয়ার যতটা সম্ভব কৌশল জানা প্রয়োজন, তা এই ১৮-১৯ বছর বয়সেই রপ্ত করে ফেলেছেন আকবর আলি। তার শরীরী ভাষায় হয়তো আগ্রাসন কম। পছন্দ করেন ঠান্ডা মাথায় নেতৃত্ব দিতে। অধিনায়ক হিসেবে সামনে আসার তুলনায় আকবর আলি বেশি স্বচ্ছন্দ সাফল্যের নেপথ্যে থাকতে। আঠেরোর ঔদ্ধত্যকে বশে রাখা এই তরুণের হাত ধরেই প্রথমবার বিশ্বকাপের মুকুট পরলো বাংলাদেশ।

কে এই আকবর আলি? তার জন্ম ২০০১ সালের ৮ অক্টোবর, রংপুর সদরে। প্রথাগত ক্রিকেট প্রশিক্ষণে হাতেখড়ি সপ্তম শ্রেণিতে। বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) অনূর্ধ্ব ১৮ দলের হয়ে প্রথম লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেন ২০১৯ সালের ৮ মার্চ। প্রতিপক্ষ ছিল আবাহনী।

তার আগেই অবশ্য টি-টোয়েন্টি ম্যাচে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল তার। ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তার অভিষেক। বিকেএসপির হয়ে তিনি খেলেন প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবের বিরুদ্ধে। এখনও পর্যন্ত ১৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে তার মোট রান ২৯৫। সর্বোচ্চ ৫৬। দু’টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তিনি করেছেন ৮৫ রান। সর্বোচ্চ রান ৮৫’ই।

এই ক্রিকেটারের কাঁধেই তুলে দেয়া হয়েছিল যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের নেতৃত্বের গুরু দায়িত্ব। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় থেকেই আকবর আলি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। বলেছিলেন, বাংলাদেশ যে শুধু নকআউটে যাবে তাই নয়, বিশ্বকাপও জিতবে।

আকবর আলির এই কথা খুব একটা ফলাও করে প্রচার হয়নি মিডিয়ায়। মেহেদী হাসান মিরাজরা পর্যন্ত পারেননি বাংলাদেশকে ফাইনালে পৌঁছে দিতে, তারা কি না খেলবে ফাইনাল, জিতবে বিশ্বকাপ! মিডিয়া হয়তো ভেবেছিল, টগবগে রক্তর ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ কথা বলছেন আকবর আলি।

কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপ যত এগিয়েছে, ততই সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে আকবর আলির ভবিষ্যদ্বাণী। লিগ পর্যায়ে কঠিন গ্রুপেই ছিল বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে, স্কটল্যান্ডের মতো দল।

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে জিতে আকবরের অধিনায়কত্বে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে পা রাখে বাংলাদেশ। একবারও তার কৃতিত্ব নিজে নেননি আকবর। বরং বলেছেন, ‘এই দলীয় সাফল্যের নেপথ্যে আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।’ প্রচুর ম্যাচ খেলার সুযোগ, বিদেশ সফর, উন্নত পরিকাঠামো তাদের পরিশীলিত করেছে। বারবার এমনটাই জানিয়েছেন অধিনায়ক আকবর।

এক বছরের বেশি সময় ধরে দল হিসেবে খেলায় তাদের মধ্যে বন্ডিংটা ভালোভাবে গড়ে উঠেছে। যার ফসল, রোববার দক্ষিণ আফ্রিকার পোচেফস্ট্রমে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়। সাফল্যের কৃতিত্বের বড় অংশ আকবর আলি দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।

যুব বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তার আগেই আকবরের বাড়ি থেকে চলে আসে দুঃসংবাদ। মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেননি দলের বাকি সদস্যরা। বাড়ি থেকে প্রায় আট হাজার কিলোমিটার দূরে তারাই আগলে রেখেছিলেন অধিনায়ককে।

মাঠের বাইরে সহজ জীবনদর্শনে বিশ্বাসী তরুণ অধিনায়ক আকবর আলি। ক্রিকেট তার জীবন; কিন্তু জীবন ক্রিকেট সর্বস্ব নয়। জয়ের পাশাপাশি পরাজয়কেও মেনে নিতে শিখেছেন। মনে করেন, ক্রিকেটই জীবনের শেষ কথা নয়। মাঠের বাইরেও একটা বড় জীবন আছে।

আকবর আলি একাধারে ব্যাটসম্যান-উইকেটরক্ষক-অধিনায়ক। অনেকেই আকবর আলির সঙ্গে মহেন্দ্র সিং ধোনির মিল খুঁজে নিয়েছেন; কিন্তু বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক জানালেন, তিনি নিজের মতো খেলতে চান। কাউকে অনুকরণ করতে চান না।

উইকেটের পিছনে থেকে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের পর্যবেক্ষণ করতে ভালবাসেন আকবর। ফলে এতে তার অধিনায়কত্বে সুবিধাই হয়। জাতীয় দলের অধিনায়কত্বকেও বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ তিনি। বরং, এই তরুণতুর্কি মনে করেন, দলীয়ে খেলা হিসেবেই দেখা উচিত ক্রিকেটকে।

উইকেটরক্ষকের মতো ‘থ্যাঙ্কসলেস’ কাজের পাশাপাশি ব্যাটিং অর্ডারেও নিজেকে রাখেন নীচের দিকে। ব্যাট করতে নামেন ছয় নম্বরে। নিজেকে ‘ফিনিশার’ বলতে ভালবাসা রংপুরের তরুণের নেতৃত্বে শুরু হল বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়।