ক্ষমা ও জান্নাত পাওয়ার প্রতিযোগিতা করবে কারা?

ক্ষমা ও জান্নাত পাওয়ার প্রতিযোগিতা করবে কারা?

ইসলাম ডেস্ক : দুনিয়ার ধন-সম্পদের পেছনে পড়ে পরকাল বরবাদ না করে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের আনুগত্য করা ফরজ। এটি মহান আল্লাহর ঘোষণা। তিনিই মানুষকে আনুগত্যের সঙ্গে তাঁর ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়ার আহ্বান করেছেন। আল্লাহর এ ক্ষমা ও জান্নাতের মতো নেয়ামত কারা পাবেন? কাদের তিনি দ্রুত ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে আহ্বান করেছেন?

আল্লাহ তাআলা এসব নেয়ামত মুত্তাকিদের জন্যই প্রস্তুত করেছেন মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন; যারা তাঁর ও নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করবে; তারাই পাবে এসব নেয়ামত। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন-

وَ اَطِیۡعُوا اللّٰهَ وَ الرَّسُوۡلَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ

আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা দয়া/অনুগ্রহ পেতে পার।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৩২)

وَ سَارِعُوۡۤا اِلٰی مَغۡفِرَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ جَنَّۃٍ عَرۡضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الۡاَرۡضُ ۙ اُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

আর তোমরা প্রতিযোগিতা (ত্বরা) কর, তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা এবং জান্নাতের জন্য, যার প্রস্থ আকাশ ও পৃথিবীর সমান, যা মুত্তাকিদের (ধর্মভীরুদের) জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৩৩)

আয়াতের প্রসঙ্গিক আলোচনা

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটা জানা কথা যে, রাসুলের আনুগত্য হুবহু আল্লাহর আনুগত্য বোঝায়। তারপরও এখানে রাসুলের আনুগত্যকে পৃথক করে বর্ণনা করার তাৎপর্যও স্বয়ং আল্লাহ তাআলা গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য কর; যাতে তোমাদের প্রতি করুণা করা হয়। এতে আল্লাহর অনুগ্রহ/অনুকম্পা পাওয়ার জন্য আনুগত্যকে যেমন অত্যাবশ্যকীয় ও অপরিহার্যকরা হয়েছে, তেমনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যকেও জরুরী ও অপরিহার্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

শুধু এ আয়াতেই নয়, বরং পুরো কোরআনুল কারিমে বার বার এর পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং যেখানেই আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে, সেখানেই রাসুলের আনুগত্যকেও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এভাবে বারবার আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়ার অর্থ হলো-

ইসলাম ও ঈমানের এ মূলনীতির প্রতিই দিকনির্দেশ করে যে, ঈমানের প্রথম অংশ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার তাওহিদ তথা অস্তিত্ব, প্রভুত্ব, নাম ও গুণ এবং ইবাদাত তথা দাসত্ব ও আনুগত্য স্বীকার করা। আর দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য করা।

এরপর মহান আল্লাহ পরবর্তী আয়াতে তার মাকবুল ও নিষ্ঠাবান বান্দার গুণাবলী ও লক্ষণাদি বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য শুধু মৌখিক দাবিকে বলা হয় না, বরং গুণাবলী ও লক্ষণাদির দ্বারাই আনুগত্যকারীর পরিচয় হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ سَارِعُوۡۤا اِلٰی مَغۡفِرَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ جَنَّۃٍ عَرۡضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الۡاَرۡضُ ۙ اُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِیۡنَ

’আর তোমরা নিজেদের রবের ক্ষমার দিকে এবং সে জান্নাতের দিকে তীব্র গতিতে চল যার (জান্নাতের) বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

কারা পাবেন জান্নাত ও ক্ষমা?

এ আয়াতে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতামুলকভাবে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের পর এটি দ্বিতীয় নির্দেশ। এ নির্দেশ সরাসরি মুত্তাকিদের দেওয়া হয়েছে।

এখানে ক্ষমার অর্থ আল্লাহর কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া হতে পারে। তবে অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, আয়াতে এমন সব সৎকর্ম এ ক্ষমার উদ্দেশ্য; যা আল্লাহ তাআলার ক্ষমা পাওয়ার করার কারণ হয়।

সাহাবা ও তাবেঈগণ বিভিন্নভাবে এ ‘ক্ষমা’র ব্যাখ্যা করেছেন; কিন্তু সারমর্ম সবগুলোরই প্রায় এক। তাহলো-

১. হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘কর্তব্য পালন’।

২. হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, ‘ইসলাম’।

৩. হজরত আবুল আলিয়া বলেছেন ‘হিজরত’।

৪. হজরত আনাস ইবনে মালেক বলেছেন ‘নামাজের প্রথম তাকবির’।

৫. হজরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের বলেছেন, ‘ইবাদাত পালন’।

৬. হজরত দাহহাক বলেছেন ‘জিহাদ’। আর

৭. হজরত ইকরিমা বলেছেন ‘তওবা’।

এসব উক্তির সারকথা এই যে, ক্ষমা বলে এমন সৎকর্ম বুঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর ক্ষমার কারণ হয়ে থাকে।

আয়াতের ব্যাখ্যায় আরও এসেছে, মহান আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে ক্ষমাকে জান্নাতের আগে উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত তিনি এদিকেই ইঙ্গিত করেছেন যে, আল্লাহর ক্ষমা ছাড়া জান্নাত পাওয়া সম্ভব নয়। কেননা, মানুষ যদি জীবনভর পুণ্য অর্জন করে এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, তবুও তার সব পুণ্য কাজ জান্নাতের মুল্য হতে পারে না। জান্নাত পাওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে- ‘আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও অনুগ্রহ।’

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘সততা ও সত্য অবলম্বন কর, মধ্যবর্তী পথ অনুসরণ কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের সুসংবাদ গ্রহণ কর। কারও কাজ তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না। শ্রোতারা বললো- আপনাকেও নয় কি হে আল্লাহর রাসুল!উত্তর হলো- আমার কর্ম আমাকেও জান্নাতে নেবে না। তবে আল্লাহ যদি স্বীয় রহমত দ্বারা আমাকে আবৃত করে নেন।’ (বুখারি, মুসলিম)

মূল কথা হলো- আমাদের আমল জান্নাতের মূল্য নয়। তবে আল্লাহ তাআলার রীতি এই যে, তিনি স্বীয় অনুগ্রহ ওই বান্দাকেই দান করেন, যিনি নেক আমল করে। বরং নেক আমলের সামর্থ্য হওয়াই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির লক্ষণ। অতএব নেক আমল করায় ক্রটি করা উচিৎ নয়।

মুত্তাকিরা যে জান্নাত পাবেন

আয়াতে এ মর্মে জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যে, এর বিস্তৃতি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সমান। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের চাইতে বিস্তৃত কোনো বস্তু মানুষ কল্পনা করতে পারে না। এ কারণে জান্নাতের আয়তনকে এ দুটির সঙ্গে তুলনা করে বুঝানো হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে যে, জান্নাত খুবই বিস্তৃত। পাশে তা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে নিজের মধ্যে ধরে নিতে পারে। এর পাশই যখন এমন, তখন দৈর্ঘ্য কতটুকু হবে; তা শুধু আল্লাহই ভাল জানেন।

কেউ কেউ বলেছেন, ‘জান্নাত লম্বা ও পাশে সমান। কেননা তা আরশের নীচে গম্বুজের মত। গম্বুজের মত গোলাকার বস্তুর আড়াআড়ি-পাশাপাশি সমান হয়ে থাকে। হাদিসে পাকে এসেছে-

নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে তখন ফেরদাউস চাইবে; কেননা তা সর্বোচ্চ জান্নাত। সবচেয়ে উত্তম ও মধ্যম স্থানে অবস্থিত জান্নাত; সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত। আর তার ছাদ হলো দয়াময় আল্লাহর আরশ।’ (বুখারি)

মুত্তাকিদের জন্য তৈরি জান্নাতের বিবরণ

জান্নাতের দ্বিতীয় বিশেষণে বলা হয়েছে, জান্নাত মুত্তাকিগণের জন্যে তৈরি করা হয়েছে। এতে বুঝা গেল যে, জান্নাত তৈরি হয়ে গেছে। এছাড়া কোরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা বুঝা যায় যে, জান্নাত তৈরি হয়ে আছে। আর এটাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা-বিশ্বাস। কেননা নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাত ও জাহান্নাম দেখেছেন।

জান্নাতের বর্ণনায় নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতের একটি ইট রৌপ্যের ও একটি ইট স্বর্ণের, তার নীচের আস্তর সুগন্ধি মিশকের, তার পাথরকুচিগুলো হীরে-মুতি-পান্নার সমষ্টি, আর মিশ্রণ হচ্ছে, ওয়ারস ও যাফরান। যে তাতে প্রবেশ করবে সে তাতে স্থায়ী হবে, মরবে না; নেয়ামত প্রাপ্ত হবে, হতভাগা হবে না; যৌবন কখনও ফুরিয়ে যাবে না; কাপড়ও কখনো ছিড়বে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, ইবন হিব্বান)

সুতরাং মুমিন মুসমানের উচিত, আল্লাহকে বেশি বেশি ভয় করা। আল্লাহ ও তাঁর নবির সুন্নাতের উপর আনুগত্য ও আমল কা। কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবন পরিচালনা করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আনুগত্য করার তাওফিক দান করুন। মুত্তাকি হওয়ার তাওফিক দান করুন। কোরআনে ঘোষিত জান্নাতের চিরস্থায়ী অধিবাসী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।