করোনায় হঠাৎ আক্রান্ত এবং মৃত্যু বাড়ল কেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানদণ্ড পরিবর্তনের পরপরই চীনে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বলছে, চীনে এখন পর্যন্ত মোট ৫৯ হাজার ৮০৪ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। শুধুমাত্র বুধবারই দেশটিতে ১৫ হাজার ১৫২ জন নতুন করে করোনায় আক্রান্ত সনাক্ত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার চীনের এই কমিশন বলছে, চীনা ভূখণ্ডেই গত ডিসেম্বর থেকে বুধবার পর্যন্ত করোনায় প্রাণ গেছে এক হাজার ৩৬৭ জনের। তবে এখন পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানি ঘটেছে বুধবার। ওইদিন দেশটিতে করোনা আক্রান্ত কমপক্ষে ২৫৪ জন মারা গেছেন।

নতুন আক্রান্ত ১৫ হাজার ১৫২ জনের মধ্যে করোনা মহামারির প্রাণকেন্দ্র হুবেই প্রদেশেরই ১৪ হাজার ৮৪০ জন বাসিন্দা রয়েছেন। বুধবার চীনে এত সংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন; যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।

চীনের জ্যেষ্ঠ মেডিক্যাল উপদেষ্টা ও সার্স বিশেষজ্ঞ ঝং ন্যানশানের নেতৃত্বে দেশটির একটি মেডিক্যাল টিম একজন রোগীর মলে জীবন্ত করোনাভাইরাস সনাক্ত করেছেন। চীনের স্টেট কি ল্যাবরেটরি অব রেসপির্যাটরি ডিজিজের উপপরিচালক ঝ্যাও জিনকুন বলেছেন, ভয়াবহ সংক্রমিত একজন রোগীর মল সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট পঞ্চম একটি হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। সেখানে এই ভাইরাসটিকে জীবন্ত অবস্থায় সনাক্ত করা হয়েছে।

ঝ্যাও বলেন, মহামারি বিশেষজ্ঞ লি ল্যানজুয়ানের নেতৃত্বে অপর একটি মেডিক্যাল টিম গবেষণায় একই ধরনের তথ্য পেয়েছে। তারা বলছেন, করোনাভাইরাস বিভিন্নভাবে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। তবে মলের মাধ্যমে এক ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে কিনা সেব্যাপারে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন এই বিশেষজ্ঞ।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের মুখপাত্র মি ফেং বলেছেন, রোগীর মল পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, পরিপাক সিস্টেমেও নতুন এই করোনাভাইরাস পুনরুৎপাদিত হতে পারে। তবে তিনি বলেছেন, সর্বাধিক সংক্রমণ হচ্ছে রোগীর সংস্পর্শ এবং কাশির মাধ্যমে।

হুবেইয়ের স্বাস্থ্য কমিশন বলছে, তারা করোনা সনাক্ত করতে নতুন ডায়াগনস্টিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন; যা বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে। বিস্তৃত পরিসরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে চিকিৎসকরা এখন বিচক্ষণতার সঙ্গে করোনা আক্রান্ত সনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য কমিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, বৃহস্পতিবার থেকে আমরা পরীক্ষার পর রোগীদের করোনার ব্যাপারে দ্রুত নিশ্চিতকরণের কাজ শুরু করবো; যাতে তারা সঠিক সময় চিকিৎসা নিতে পারেন। এর আগে শুধুমাত্র টেস্ট কিটের মাধ্যমে রোগীদের পরীক্ষা করা হতো এবং দেশজুড়ে এই টেস্ট কিটের সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

বেইজিংয়ের চ্যাওইয়াং হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং চীন সরকারের কেন্দ্রীয় পরামর্শক গ্রুপের বিশেষজ্ঞ টং জ্যাওহুই বলেন, জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে আগের পরীক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি এখন থেকে সিএটি স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করে করোনা সনাক্ত করা হবে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিসিটিভিকে দেয়া এক স্বাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা যখন নিউমোনিয়ার চিকিৎসা দেন, তখন তারা মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ধরতে পারেন। এছাড়া বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের জন্য আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বৃদ্ধি এই রোগের ব্যাপারে আমাদের অতিরিক্ত কিছু বিষয় জানতে সহায়তা করবে।

হুবেইয়ের এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাক-লিয়াং। তিনি বলেন, করোনা সনাক্তে আগের মানদণ্ডের কারণে কোনও ধরনের পরীক্ষা করার আগেই কিছু রোগী মারা গেছেন। অর্থাৎ তারা যথাযথ পরীক্ষা এবং করোনা আক্রান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে নতুন করে একদিনে (বুধবার) ১৩ হাজার ৪৩৬ জনকে করোনা আক্রান্ত সনাক্ত করা হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর উহানের একটি সামুদ্রিক খাবারের বাজার থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের নামকরণ করেছেন কোভিড-১৯ নামে। ইতোমধ্যে বিশ্বের ২৪টি দেশে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৬৩ জন। আরও লাখ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপদেষ্টা চেন ইজিন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ে দেশটির গঠিত জাতীয় কমিটির প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। মঙ্গলবার এক বৈঠকের পর তিনি বলেছেন, উহানের পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত। প্রাদুর্ভাবের বিস্তারের সঠিক পরিমাপ এখনও করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হিসেবে উহানে করোনা সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ব্যাপক হতে পারে।