উল্টো রথে চলছে জাবি ছাত্রলীগ

জাবি প্রতিনিধি : জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যখন ভাবমূর্তি ভালো করতে উদ্যোগী হয়েছে, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ছাত্রলীগ চলছে উল্টো রথে। গত ১৫ দিনে এই শাখার নেতাকর্মীরা ভর্তি পরীক্ষা আটকে দেওয়া, সাংবাদিক ও ছাত্রী মারধর, ছাত্রী অপহরণ চেষ্টা, হলের রুম ভাড়া দেওয়া, ক্যান্টিন বয়দের মারধরসহ ইভটিজিং, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগের কালি মেখেছে গায়ে।

ছাত্রলীগের এমন সব বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া নিয়ে শঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলকে এ শঙ্কার কথা তুলে ধরেন উপাচার্য ড. ফারজানা ইসলাম। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে ভর্তি পরীক্ষা।

গত ছয় মাস ধরে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত কান্ড ঘটিয়ে চলেছেন জাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মাত্রা বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। কয়েকটি ঘটনায় বেশ কজনকে সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গত এপ্রিল মাসে আন্তবিভাগ ফুটবল খেলার সময় ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী কাজলকে মারধর করে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪২তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক নিলাদ্রী শেখর মজুমদার। এর জের ধরে গত শুক্রবার (৫ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে বটতলায় কাজল তার বন্ধুদের নিয়ে নিলাদ্রিকে মারধর করেন। এতে শহীদ সালাম বরকত হল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণ করে।

এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ার অপরাধে সাংবাদিকতা বিভাগের ৪৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিসহ একই বিভাগের এক ছাত্রীকে মারধর করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এ ঘটনায় ২ অক্টোবর দুপুরে নেতৃত্বদানকারী নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪২তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও শহীদ রফিক জব্বার হলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী নেজাম উদ্দিন নিলয়সহ সাতজনকে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। কিন্তু বিকেলে নিলয়সহ তিনজনকে বাদ দিয়ে চার শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।

এ আদেশের দুই দিন পর ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে সেই বহিষ্কারাদেশও স্থগিত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভর্তি পরীক্ষা যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়, সে জন্য বহিষ্কারাদেশ স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানান উপাচার্য।

সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, বহিষ্কৃত চার শিক্ষার্থী জাবি ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল রানার অনুসারী। আর নিলয়সহ তিনজন (যাদের বহিষ্কার তুলে নেয়া হয়েছে) সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান চঞ্চলের অনুসারী। সভাপতি গ্রুপের চাপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরে চারজনের বহিষ্কারাদেশ স্থগিত করে।

৩ অক্টোবর পঁচা ও বাসি ভাত সরবরাহের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে মীর মশাররফ হোসেন হলের তিন ক্যান্টিন কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে দর্শন বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও এক ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে।

২ অক্টোবর দুপুরে জালটাকার নোট সরবরাহের অভিযোগে এক ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীর অভিভাবককে প্রথমে বটতলা ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে নিয়ে কয়েক দফা মারধর করেন শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা ওই ব্যক্তির কাছে থাকা বেশ কিছু টাকা রেখে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে জানা যায়, তিনি জালটাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। বিষয়টি ভুল-বোঝাবুঝি ছিল।

২ অক্টোবর মধ্যরাতে ‘ইভ টিজিংয়ের’ সূত্র ধরে মীর মশাররফ হোসেন হল ও আল বেরুনি হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় গুলি ছোড়া, বাইকে আগুন, কাচের বোতল নিক্ষেপসহ ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি হয়। এতে ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হন।

এরই জের ধরে পরদিন বিচার দাবি করে আল বেরুনি হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জীববিজ্ঞান অনুষদের ১ম শিফটের ভর্তি পরীক্ষা আটকে দেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের হস্তক্ষেপে নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা পরে পরীক্ষা শুরু হয়। এ ঘটনায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শাখা ছাত্রলীগ ১০ জন নেতাকর্মীকে আগামী এক মাসের জন্য বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়।

প্রেম ও বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় ২৭ সেপ্টেম্বর অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের ৪৩তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী জাহিদুল ইসলাম সজল তার বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে একই বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের এক ছাত্রীকে অপহরণের চেষ্টা চালান। এ ঘটনায় সজলকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এখনো সজল ওই ছাত্রী ও তার পরিবারকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। ফলে নিরাপত্তা চেয়ে জাবি প্রশাসন বরাবর আবেদন করেন ওই ছাত্রী।

এদিকে হলের রুম ভাড়া দিয়ে আবার আলোচনায় এসেছেন নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি হামজা রহমান অন্তর। ২৭ সেপ্টেম্বর ওই নেতার বিরুদ্ধে শহীদ রফিক জব্বার হলের ৪১৮ নং কক্ষের ভাড়া বাবদ চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন গণিত বিভাগের ৪০তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সাজিদ হাসান।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, এ ধরনের কর্মকান্ড ছাত্রলীগের আদর্শ বহির্ভূত। যারা এমন কর্মকান্ড করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ছাত্রলীগের কোনো কর্মকান্ডে ভর্তি পরীক্ষা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না বলে জানান জাবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা। তিনি বলেন, ‘আমরা ভর্তি ইচ্ছুদের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প গঠন, তথ্য সহায়তা কেন্দ্রসহ নানাভাবে সহযোগিতা করছি। আর যারা বিতর্কিত কাজ করেছে তাদের ১০ জনকে এক মাসের সাময়িক বহিষ্কার করার সুপারিশ করেছি।’

Inline
Inline