আজহার থেকে সৌরভ- কেউই ক্রিকেট চায় না পাকিস্তানের সঙ্গে

ক্রীড়া ডেস্ক : কাশ্মীর হামলার রেশ কতদুর গড়াবে সেটা বলা মুস্কিল। পুলওয়ামায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ৪৫ জন ভারতীয় সিআরপিএফের সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে এক যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন, যে কোনো সময় লেগে যেতে পারে দু’দেশের মধ্যে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের রাজনীতিবীদরাই নয় শুধু ভারতের সাধারণ মানুষ, খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, অভিনেতা- প্রায় সবাই একযোগে অবস্থান নিয়েছেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। ভারতীয় ক্রিকেটাররা ক্ষোভের সঙ্গেই নিন্দা জানিয়েছেন পুলওয়ামার ঘটনায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের ক্রিকেট সম্পর্ক ছিন্ন করারও পক্ষে মত দিচ্ছেন রাজনীতিবীদ থেকে শুরু করে সাবেক ক্রিকেটাররা।

আগামী বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচ না খেলার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চাপ বাড়ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের ওপর। সাবেক অফ স্পিনার হরভজন সিং সরাসরি দাবি করেছেন, যেন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি বয়কট করে ভারত। যদিও বিসিসিআই এ নিয়ে এখনও কোনো মন্তব্য করেননি।

তবে বিসিসিআইয়ের এক কর্মকর্তা হরভজনের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, ‘হরভজন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ম্যাচ না-খেলা নিয়ে মন্তব্য করেছে; কিন্তু সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হলে ভারতের ম্যাচ ছেড়ে দেওয়া উচিত কিনা, তা নিয়ে পরিষ্কার করেনি। সুতরাং এখনই আমাদের ভারত-পাক ম্যাচের ভবিষ্যদ্বাণী করা ঠিক হবে না।’

তবে হরভজনের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রইলেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি। তিনি দাবি করেছেন, শুধু ক্রিকেটই নয়, ভারতের উচিৎ হবে সব ধরনের খেলাতেই পাকিস্তানকে বয়কট করা। শুধু তাই নয়, সৌরভ এও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচ না খেললেও ভারতের বিশ্বকাপ অভিযানে কোন প্রভাব পড়বে না।

৩০ মে থেকে ইংল্যান্ডের মাটিতে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ১৬ জুন ম্যানচেস্টারে বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নামার কথা টিম ইন্ডিয়ার। ওই ম্যাচটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে কলকাতার মহারাজ স্পষ্ট করেননি যে, শুধুমাত্র গ্রুপ পর্বের ম্যাচেই পাকিস্তানকে বয়কট করা উচিত, নাকি সেমিফাইনাল-ফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হলেও পাকিস্তানকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত টিম ইন্ডিয়ার!

পুলওয়ামার সন্ত্রাসী হামলায় কারণে সৌরভের জাতীয়তাবাদী ভাবধারাকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছে যে, তিনি মনে করেন একটা কড়া বার্তা দেয়া উচিত পাকিস্তানকে। সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সৌরভ বলেন, ‘পুলওয়ামার ঘটনার পর ভারতবাসীর মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং যথাযথ। এই ঘটনার পর পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সিরিজ খেলা কখনোই সম্ভব নয়। আমার তো মনে হয় এই হামলার পর শুধু ক্রিকেটই নয়, হকি-ফুটবলের মতো অন্য খেলাগুলোতেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নামা উচিত নয় ভারতের।’

বিশ্বকাপের ম্যাচ প্রসঙ্গে সৌরভ বলেন, ‘এটা ১০ দলের বিশ্বকাপ। প্রতিটা দল একে অপরের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে। তাই আমি মনে করি ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচ নাও খেলে, তবে তাতে কোহলিদের বিশ্বকাপ অভিযান ব্যাহত হবে না। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস, ভারতকে ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন আইসিসির পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে এটা দেখতে হবে যে আইসিসির সিদ্ধান্তকে বদলানোর ক্ষমতা ভারতের আছে কি না। শেষমেশ যাই হোক না কেন, আমার মনে হয় পাকিস্তানকে একটা কড়া বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।’

সৌরভ-হরভজনের সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক আজহারুদ্দিনও। জুনে আসন্ন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কটের দাবি তুললেন ভারতের সাবেক এই অধিনায়কও। আজহারের যুক্তি, পাকিস্তানের সঙ্গে যখন দ্বি-পাক্ষিক সিরিজ না খেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তখন অন্য কোনও প্রতিযোগিতায়ও তাদের সঙ্গে খেলা উচিত নয়।

বুধবার ভারতের একটি চ্যানেলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আজহার বলেন, ‘দ্বি-পাক্ষিক সিরিজে যখন আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলছি না, তখন বিশ্বকাপেই বা খেলব কেন? হরভজনের সঙ্গে একমত হয়েই আমি বলতে চাই, দেশের চেয়ে বিশ্বকাপ বড় হতে পারে না।’

কার্গিল যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৯৯ বিশ্বকাপে ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হয়েছিল। তখন ভারতের অধিনায়ক ছিলেন আজহার। সেই ম্যাচের অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন যুদ্ধ চলছিল বলে চাপা একটা উত্তেজনা তো ছিলই। আমাদের ভয় ছিল দর্শকদের মধ্যে না সংঘর্ষ বেধে যায়। আমাদের জয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনির জওয়ানরাও উৎসব করেছিলেন।’

এরপরই তার যুক্তি, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে খেলতে হলে সব জায়গায় খেলো। না হলে কোথাও খেলো না। আইসিসি ও আমাদের বোর্ডের এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা উচিত।’

ভারতের কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদও পাকিস্তানের সঙ্গে সবরকমের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক বন্ধ করার ডাক দিলেন। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, ‘ক্রিকেটীয় বিষয়ে আমি কোনও কথা বলতে চাই না। পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক নয়; কিন্তু বিশ্বকাপ যেহেতু আন্তর্জাতিকমানের একটি টুর্নামেন্ট তাই আইসিসি এবং বিসিসিআই নিরাপত্তার বিষয়টি খতিয়ে দেখেই এবিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে আমার বিশ্বাস।’

তবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে প্রসাদ বলেন, ‘নৃশংস জঙ্গি হামলার ঘটনায় ইমরান খানের তরফ থেকে কোনও শোকবার্তা পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি নিহতদের জন্য। তাই আমার মতে ক্রিকেটীয় কোনওরকম সম্পর্কস্থাপনেও না বলার সময় এসেছে।’