অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

21feb20ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি : বাঙালি জাতির মননে অনন্য মহিমায় সমুজ্জ্বল মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস শনিবার। আত্মত্যাগের অহঙ্কারে ভাস্বর একটি দিন। আজ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ কণ্ঠে নিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ভাষা রক্ষার দিন। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারের মতো অগণিত ভাইয়ের রক্তে রাঙানো মহান একুশে ফেব্রুয়ারি।

৬৩ বছর আগে ১৯৫২ সালের এ দিনে যারা আমাদের ‘মুখের ভাষা কাইড়্যা নিতে’ চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে সাহসে দিব্যকান্তি জ্যোতিষ্মান পুরুষরা অনল ঝরা চোখে লালচে মুখে দেশের সব শহরের রাস্তায় রাস্তায় মুষ্টিবদ্ধ হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল এক অলৌকিক প্রত্যয়ে। মায়ের মুখের ভাষা বাংলা’র মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। প্রতিটি বাংলা অক্ষর পরিণত হয়েছিল বাঙালির এক একটি জীবনে। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের ১৮৯টি দেশে গভীর শ্রদ্ধায় আজ স্মরণ করা হবে বাংলা ভাষার জন্য আত্মবলিদানকারী শহীদ ভাইদের। একুশের প্রথম প্রহর থেকে আকাশ-বাতাস মন্দ্রিত করে ভেসে বেড়াবে হৃদয়ের গভীর বেদনা থেকে উঠে আসা বিষাদময় সুরথ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।’ প্রভাতফেরির শোকমিছিল থেকে উত্থিত হবে নতুন সাহস, নতুন শক্তি। গোটা জাতির অবনত শ্রদ্ধা, শোক আর প্রাণোৎসারিত ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে স্মৃতির মিনার শহীদ মিনারের বেদি প্রাঙ্গণ।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণী প্রদান করেছেন।
১৯৫২ সালের এ দিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ-রাঙ্গানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শংকিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও শাসকগোষ্ঠীর প্রভূসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং ভাষার ভিত্তিতে বাঙালির জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ। ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন ‘মায়ের ভাষার’ মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নব প্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ আজ রাতে একুশের প্রথম প্রহর ১২টা ০১ মিনিটে সর্বপ্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর পরপরই শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
একুশের প্রভাত ফেরি প্রদক্ষিণের এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রণয়ন করা হয়েছে শহীদ মিনারে প্রবেশের রোডম্যাপ। শুক্রবার রাত আটটা থেকেই এটি কার্যকর হবে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত শহীদ মিনার ও এর আশপাশের এলাকায় সর্বসাধারণের চলাচলের সুবিধার্থে যানবাহন চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। শুধুমাত্র সুর্নিদিষ্ট স্ট্রিকার সম্বলিত যানবাহন ওই এলাকায় প্রবেশ করতে পারবে। অন্যদিকে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাত ১২টা ৪১ মিনিটের পর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
শহীদ মিনার এলাকায় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড রোধে ছদ্মবেশে ও সাদা পোশাকে র‌্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা নজরদারী করবে। তাছাড়া র‌্যাবের বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও র‌্যাব ডগ স্কোয়াড শহীদ মিনার এলাকায় প্রয়োজনীয় স্যুইপিং কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রস্তুত থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্সও।
২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ছুটির দিন। এদিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
২১ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সমপ্রচার করবে। এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।