৭৫ শতাংশের বেশি পাস্তুরিত দুধ অনিরাপদ: গবেষণা

নিজস্ব সংবাদদাতা : স্থানীয় বাজারে পাওয়া পাস্তুরিত তরল দুধের ৭৫ ভাগই অনিরাপদ বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীদের এক গবেষণার প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞানীরা দুগ্ধখামার থেকে শুরু করে বিক্রির দোকান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন কোম্পানির দুধের নমুনা পরীক্ষা করে তাতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পেয়েছেন, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। এসব দুধ না ফুটিয়ে পান করা বিপজ্জনক হতে পারে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকরা দেশের ৪৩৮টি কাঁচা দুধের নমুনা এবং বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণায় আটজন বিজ্ঞানী জড়িত ছিলেন। গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আইসিডিডিআরবির ফুড মাইক্রোবায়োলজির প্রধান মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তারা গাইবান্ধা, নীলফামারী, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাট জেলার ১৮টি উপজেলা থেকে ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৩৮৭টি নমুনা প্রাথমিক দুধ উৎপাদনকারী বা কৃষকের কাছ থেকে, ৩২টি নমুনা দুধ সংগ্রহের স্থান বা আড়ত থেকে, ১৫টি নমুনা দুধ শীতলীকরণ কারখানা এবং চারটি নমুনা স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া ঢাকা ও বগুড়া থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হয়, এমন পাস্তুরিত প্যাকেটজাত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করেন। যেসব প্রতিষ্ঠানের দুধ শীতলীকরণ কারখানা আছে (আগের নমুনা) এই প্যাকেটগুলো সেসব প্রতিষ্ঠানের। গবেষণায় কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ গবেষণায় আর্থিক সহায়তা করেছে আন্তর্জাতিক এনজিও কেয়ার।

গবেষকেরা দেখেছেন, খামার থেকে শুরু করে দোকানে বিক্রি হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত হয়। এই দূষণের মাত্রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি।

গবেষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে দুধের মূল গুণ, অর্থাৎ এর পুষ্টিগত গুণাগুণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।’ তিনি বলেন, খাওয়ার জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে উৎপাদনের স্থান থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পাস্তুরিত দুধকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করা জরুরি।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক দুধ উদপাদনকারী পর্যায়ে ৭২ শতাংশে কলিফর্ম এবং ৫৭ শতাংশ নমুনায় ফিক্যাল কোলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। নমুনাগুলোর ১১ শতাংশ উচ্চসংখ্যায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া দূষিত।

ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং দুধে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির ফলে বোঝা যায় যে দুধ জীবাণু বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা দূষিত, যা উষ্ণ রক্তের প্রাণীর মলে থাকতে পারে বা দুধ দোয়ানোর সময় দুধে মিশতে পারে।

উৎপাদনকারীদের থেকে দুধ সংগ্রহের স্থানে দেখা যায়, নমুনাগুলো উচ্চ সংখ্যক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া (১০০ সিএফইউ/এমএল) দ্বারা দূষিত এবং মল দ্বারা দূষিত হওয়ার হার ছিল ৯১ ভাগ এবং ৪০ ভাগ নমুনায় উচ্চসংখ্যক ইকোলাই ছিল।

গবেষকদের মতে, দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে দোকান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত থাকে যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। আর তাই পাস্তুরিত তরল দুধ ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

পরীক্ষিত পাস্তুরিত দুধের নমুনার প্রায় ৭৭ শতাংশে উচ্চমাত্রার ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা বিএসটিআইয়ের মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। এছাড়া ৩৭ শতাংশ নমুনায় কলিফর্ম এবং ১৫ শতাংশ নমুনায় মলবাহিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

ব্যাকটেরিয়ার এ উপস্থিতি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এজন্য কাঁচা দুধ না খেয়ে ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।