১২ হাজারেরও বেশি রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা সংবাদদাতা : গাইবান্ধা ২০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স চালক হাবিবুর রহমান এ্যাম্বুলেন্স চালান দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে। কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই কর্মজীবনে ১২ হাজারেরও বেশি রোগীকে তিনি হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। হাসি ফুটিয়েছেন রোগী ও স্বজনদের মুখে। এতে তিনি নিজেও পেয়েছেন তৃপ্তি।
হাবিবুর রহমান বলেন, ১৯৯২ সালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম চাকরিতে যোগদান করেই আমি হতাশায় ভেঙে পড়ি। এই হাসপাতালে কোনো এ্যাম্বুলেন্স না থাকায় রোগী পরিবহন করতে পারিনি। সে সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে রোগী ও স্বজনদের আর্তনাদ দেখে নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েছি। এর এক বছর পরে আমার বদলি হয় ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বে পলাশবাড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সেখানে থাকাকালীন মহাসড়কে কোনো দুর্ঘটনার সংবাদে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে খুব দ্রুত ছুটে গেছি ঘটনাস্থলে। আশপাশের লোকজনের সহযোগিতা নিয়ে রোগীকে গাড়ীতে তুলে নেয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছে আবার নিজেই রোগীকে গাড়ী থেকে নামিয়ে ভর্তি করেছি হাসপাতালে। এখানে থাকাকালীন মহাসড়কের বেহাল দশা ও সংস্কার কাজের সময় রোগী পরিবহনে সমস্যায় পড়তে হয়েছে বেশি। এক ঘণ্টার পথ রংপুরে যেতে লেগেছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময়। তিনি আরও বলেন-এর দুই বছর পরে আবার বদলি হয়ে যেতে হয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এই দুই হাসপাতাল মহাসড়কের খুব কাছে হওয়ায় সবসময় এলার্ট থাকতে হয়েছে। এমনও হয়েছে হাসপাতাল থেকে সবে বাড়িতে ফিরে আবার এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটতে হয়েছে রংপুর কিংবা ঢাকায়।
হাবিবুর রহমান বলেন, এখানে থাকতে একদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সে সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নুরুল স্যার হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকায় নেয়ার পথে গোবিন্দগঞ্জের পথে তিনি আমার গাড়ীতেই মারা যান। এ ঘটনায় আমি বেশ মর্মাহত হই। এখানে প্রায় ১০ বছর চাকরির পর আবার বদলি হয়ে যোগদান করি গাইবান্ধা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে। পরে কয়েকমাস পরে আবার বদলি হলে যোগদান করি গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালে। এরপর থেকে অদ্যবধি এখানেই রয়েছি এ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে।
তিনি আরও বলেন, এই দীর্ঘ সময়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছি গ্রামে রোগী আনতে গিয়ে। কেন না রাস্তা ছোট থাকায় গাড়ী ধীরে ধীরে চালাতে হয়েছে। অন্য কোনো গাড়ী সামনে এলে সেটিকে সরিয়ে দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি হতো অনেক। তাই বাড়ি করার আগে রাস্তার জন্য যাতে জমি রাখা হয় সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া সড়কের বেহাল দশায় রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে সময় লাগে সবচেয়ে বেশি। রোগীকেও কষ্ট পেতে হয় তার এসব অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিটি সড়ক পর্যাপ্ত প্রশস্ত ও সড়কগুলো যেন সবসময় ভালো থাকে সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর রাখার জন্য অনুরোধ জানান এ্যাম্বুলেন্স চালক হাবিবুর রহমান।
একজন সহকারীর প্রয়োজন জানিয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, কোনো রোগীর নাক থেকে অক্সিজেনের পাইপ সরে গেলে সেটি ঠিক করার জন্য আবার এ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে আমাকেই ঠিক করে দিতে হয়। এতে করে রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দিতে সময় বেশি লাগে। শুধু এই একটি কারণেই নয় রোগী ও তাদের স্বজনদের আরও সেবা প্রদান ও আমাদের সহযোগিতার জন্য এ্যাম্বুলেন্স চালকদের জন্য একজন সহকারীর বিশেষ প্রয়োজন।
গাইবান্ধা সন্ধানী ডোনার ক্লাবের উপদেষ্টা নাহিদ হাসান চৌধুরী রিয়াদ বললেন, গাইবান্ধায় যোগদানের পর থেকেই দেখছি হাবিবুর রহমান অত্যন্ত আন্তরিক ও রোগী পরিবহনে সর্বোচ্চ সেবাটাই দেন। তিনি অন্য আর দশজন এ্যাম্বুলেন্স চালকদের থেকে আলাদা। যত দ্রুত সম্ভব তিনি রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন। তার এই সুদীর্ঘ জীবনে তিনি কোনোদিন কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে আমার জানা নেই।
এ্যাম্বুলেন্স চালক হাবিবুর রহমানের বাড়ি গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালের পার্শ্ববর্তী পৌর এলাকার পলাশপাড়ায়। কৃষক পরিবারের সন্তান হাবিবুর রহমান ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়।