হারিয়ে যেতে বসেছে নানান প্রজাতির টিয়া পাখি

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, গাইবান্ধা সংবাদদাতা : আমাদের দেশে সাত প্রজাতির টিয়া পাখির বসবাস। এগুলো হল চন্দনা টিয়া, বাসন্তী লটকন টিয়া, মদন টিয়া, লালমাথা টিয়া, মেটেমাথা টিয়া, ফুলমাথা টিয়া ও সবুজ টিয়া।
এরা সাধারণত বন, বৃক্ষবহুল এলাকা, আর্দ্র পাতাঝরা বন, খোলা বন, পাহাড়ি বন, চা-বাগান, বসতবাড়ির বাগান, আবাদি জমি, পুরনো বাড়িতে বসবাস ও বিচরণ করে। সাত প্রজাতির মধ্যে সবুজ টিয়ার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পাখিদের মধ্যে মাত্র কয়েক জাতের পাখি আছে যারা মানুষের মতো কথা বলতে পারে, তাদের মধ্যে টিয়া পাখি অন্যতম। আর এই টিয়া পাখির কথা বলার ক্ষমতার কারণেই তারা মানুষের প্রিয় পোষা পাখি হয়ে উঠেছে। শিশুদের মিনা কার্টুনের মিঠু থেকে শুরু করে বাংলার ছড়া, কবিতা, গল্প, পালাগানসহ সব জায়গায় আছে টিয়া পাখির কথা। টিয়া পাখি যেমন টিয়া পাখিটি রঙের আভিজাত্য, সুন্দর ও স্মার্ট চালচলন, বুদ্ধিমত্তা আর খুব সহজেই পোষ মানার ফলে সকলের বন্ধু হয়ে ওঠে।
টিয়া যা যা খেতে ভালবাসে খাদ্য তালিকায় আছে পত্রগুচ্ছ, ফুল, ফল, লতাপাতা, বীজ ও ফলের মিষ্টি রস। তাছাড়া টুকটাক মানুষ যা খায় প্রায় সবকিছু খেয়ে থাকে এই প্রিয় পাখিটি। খুবই পরিচিত একটি পাখি টিয়া সবুজ রঙ, লম্বা লেজ ও বড় চ্যাপ্টা ঠোঁট দেখলেই সবাই টিয়া পাখি চিনে ফেলে। কিন্তু টিয়ার মধ্যে অনেক প্রজাতি আছে, যা অনেকেই খেয়াল করেন না। বাংলাদেশে মোট ৬ প্রকার টিয়া পাওয়া যায়

বাসন্তী লটকন টিয়া : এর ইংরেজি নাম এবং দ্বিপদী বা বৈজ্ঞানিক নাম লাল ঠোঁট ও সবুজ দেহের সুন্দর গোলগাল এক টিয়া। এর লেজ অন্য টিয়াদের মতো লম্বা নয় বরং খাটো এর কোমরের কিছু পালক লাল হয়ে থাকে।
সচরাচর পারিবারিক দল বা ঝাঁকে এদের পাওয়া যায়। বাংলাদেশের কাপ্তাইয়ের ন্যাশনাল পার্কে বেশী দেখা যায়। এরা ডুমুর ফল, বট ফল, বাঁশ বীজ, ফুলের মিষ্টি রস খেয়ে থাকে। এরা গাছে উল্টো করে ঝুলে থাকতে, খাবার খেতে ও বিশ্রাম নিতে পছন্দ করে। খাঁচায় পালনের জন্য এই টিয়া অনেক জনপ্রিয়। বাংলাদেশে এই বাসন্তী লটকন টিয়া প্রচুর পরিমানে অবৈধভাবে ধরা ও বিক্রি হয়। এই অবৈধ শিকার একে হুমকিতে ফেলেছে।
মদনা টিয়া : এর ইংরেজি নাম এবং দ্বিপদী বা বৈজ্ঞানিক নাম এটি অত্যন্ত সুন্দর টিয়া। এর ঠোঁট লাল, মাথা বাদামী, পিঠ সবুজ ও বুক লাল। গলায় সুন্দর একটি কালো মালা আছে মেয়ে পাখির ঠোঁট কালো। এর লেজ লম্বা ও সবুজ এদের বাংলাদেশের অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। সিলেটের চা বাগান, চট্টগ্রাম, ভাওয়াল মধুপুর বনে এদের বেশী পাওয়া যায়। দলবেঁধে তীক্ষ আওয়াজ করে আকাশে উড়ে যেতে এদের প্রায়ই দেখা যায়। পৃথিবীতে এর ৭টি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে এই উপপ্রজাতিটি পাওয়া যায়।
লালমাথা টিয়া : এর ইংরেজি নাম এবং দ্বিপদী বা ল্যাটিন নাম এর ঠোঁট বড় ও বড়শির মতো বাকানো হলুদ রঙের। কিছু অংশ ছাড়া পুরো দেহই সবুজ এর মাথা খুবই সুন্দর নীলচে লাল রঙের যা একে আলাদা করেছে অন্য সব টিয়া থেকে। ডানার উপরের দিকে ছোট একটি গাঢ় লাল স্পট আছে এর লেজ নীলাভ সবুজ, লম্বা ও সরু। বাঁশঝাড় ও জঙ্গলের গাছে এরা দলবেঁধে রাত কাটায়। উড়ার সময় এরা অবিরাম টুই-টুই-টুই-টুই শব্দ করে তীক্ষস্বরে ডাকতে থাকে।
চন্দনা টিয়া : ইংরেজিতে এর নাম এবং ল্যাটিন বা দ্বিপদী নাম চন্দনা টিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় টিয়া। এটি সারা পৃথিবীর মধ্যেও অনেক বেশী জনপ্রিয় এর ঠোঁট গাঢ় টুকটুকে লাল। মাথার পিছনে ঘাড়ে ও ডানার উপরের দিকে মোটা লাল দাগ পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীর ৫টি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এটি বর্তমানে বাংলাদেশে খুবই কম দেখা যায়।
সবুজ টিয়া : ইংরেজিতে একে বলে যার বৈজ্ঞানিক নাম এর সবুজ রঙ অনেক বেশী সুন্দর। যেন কচি পাতার সবুজ রঙে এর পুরো দেহ আবৃত। এর ঠোঁট টুকটুকে লাল গলায় গোলাপী একটা রিং রয়েছে। এর লেজ অনেক লম্বা ও সুচালো।
৪টি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব এলাকায় একে পাওয়া যায়।
ফুলমাথা টিয়া : এর ইংরেজি নাম দ্বিপদী নাম গোলাপী মাথা ও সবুজ রঙের দেহ এই টিয়ার প্রধান আকর্ষণ। বুকের পালক হালকা সবুজ ও পীঠ গাঢ় সবুজ। এর ঠোঁট হলুদ এবং গলায় কালো বন্ধনী দেখা যায় এর লেজ অনেক বড় ও সূচালো হয়ে থাকে। সিলেটের পাহাড়ি ও চা বাগান এলাকায় একে বেশী দেখতে পাওয়া যায়। ২টি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমনকি ধানক্ষেতের পাঁকা ধানও টিয়ারা খায়। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে গেলে সন্তানদের সঙ্গে যেমন ভাগ করে খেতে হয়, তেমনি করে আপনার ভালোলাগা এই পাখিটির সঙ্গেও খেতে পারেন। স্বাভাবিকভাবে অধিকাংশ প্রজাতির টিয়া গাছে গর্ত খুঁড়ে বাসা বানায়। তবে বাসায় চিলেকোঠায় বড় খোপ ঘর থাকলে আর সঙ্গে দুই জাতের বেশ কিছু টিয়া থাকলেই হবে। টিয়া পাখির ডিমে প্রায় ৩০ দিন তা দিয়ে পাখির বাচ্চা ফোটায়। মেয়ে পাখি একাই ডিমে তা দেয় ছেলে পাখি মাঝে মধ্যে মেয়ে পাখিকে খাবার খাওয়ায়। তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে যে বাচ্চা বের হয় তা সচরাচর অন্ধ থাকে। খোপ ঘরে বাচ্চারা দুই থেকে তিন মাস পিতামাতার যত্নে কাটায় এবং এ সময় বাচ্চাদের ওগরানো খাবার খাওয়ানো হয়। দীর্ঘদিন পিতামাতার যত্নে থাকার সঙ্গে এদের মগজের আকার বড় হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কিত হতে পারে। বড় মগজের কারণে টিয়ার সহজে জটিল কৌশল শেখা ও শব্দধারণ করার ক্ষমতা বেশি থাকে।
অনেক টিয়া ৫০ বছরেরও বেশি বাঁচে। নদীর ধারে গোধূলিলগ্নে শত শত টিয়া পাখি ডেকে দিগন্তের দিকে উড়ে যায়, সেদৃশ্য কখনোই ভোলার নয়। অলস দুপুরে চারদিক যখন নিঃশব্দ হঠাৎ আপনার নাম ধরে ডেকে উঠল প্রিয় পাখিটি, সেই ডাকটাও কখনো ভোলার নয়!