হলমার্কের টাকা উদ্ধারে সময় লাগবে

সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেয়া টাকা উদ্ধারে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ লুণ্ঠন করেছে তাদের সে পরিমাণ সম্পদ নেই।

বুধবার সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন এমডি। এই ঘটনায় করা ১৬টি মামলার রায় চলতি বছরের মধ্যে আসতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

হলমার্ক গ্রুপকে দেশের জন্য অভিশাপ আখ্যা দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে স্বতন্ত্র আদালত গঠনের তাগিদ দিয়েছেন সোনালী ব্যংকের এমডি। হলমার্কের ঋণ নামে ব্যাংককে লুণ্ঠন করে তিনি বলেন, ‘এ টাকা উদ্ধার করা সম্ভব। তবে সময় লাগবে। মামলা চলছে এখনো।’

২০১০ ও ২০১১ সালের বিভিন্ন তারিখে হলমার্ক গ্রুপ বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন (বর্তমানে রূপসী বাংলা) শাখা থেকে প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। সুদে আসলে সেটি সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এতদিনে।

২০১২ সালের ৪ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় তিন হাজার ৬৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আসামিদের মধ্যে আছেন হলমার্কের এমডি তানভীর মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ। এর মধ্যে মাসে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের কথা বলে জামিন নিয়ে গত তিন বছরে এক টাকাও পরিশোধ করেননি জেসমিন।

২০১০ থেকে ১২ সালের সময়কে ব্যংকিং সেক্টরের সুনামী আখ্যা দিয়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘আমাদেরকে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। আমাদের যে খেলাপি ঋণ আছে তার ৫৪ শতাংশ পাঁচটি শাখাতেই।’ তিনি বলেন, ‘কিছু লোকের কাছে আমাদের টাকা আটকে আছে। আমি আট থেকে নয় মাস হলো এখানে এসেছি, এখন ক্রমাগত উন্নতি হচ্ছে। খেলাপি ঋণ কমছে।’

হলমার্কের কারণে বেড়েছে খেলাপী ঋণ

সোনালী ব্যাংক এমডি বলেন, ‘হলমার্কে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল তার বিপরীতে সমপরিমাণ সম্পদ নেই। মূলত এখানে ঋণ বিতরণ করা হয়নি, হয়েছে লুণ্ঠন। আর এ কারণেই ব্যাংকটির প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।’

এমডি বলেন, সোনালী ব্যাংকের ২০ টি শাখার অবস্থা খুবই নাজুক। যেখানে প্রায় ৮৪ শতাংশ খেলাপী ঋণ রয়েছে। এছাড়া পাঁচটি শাখার খেলাপি ঋণ ৫৪ শতাংশ।

এমডি জানান, সোনালী ব্যাংকে বর্তমানে আমানত আছে এক লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির দৃশ্যমান খেলাপি ১০ হাজার কোটি টাকা। সাত হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। আরও দুই হাজার কোটি টাকা পুন:তফসিলের রিটে আটকে আছে। বিতরণ করা ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা নেই। তাই যে করেই হোক খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে।

তবে ১২১০ টি শাখার মধ্যে ৬০০ শাখার খেলাপি ঋণ প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকায় বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সোনালী ব্যাংক এমডি।

খেলাপি ঋণের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু দুষ্ট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ব্যাংকের টাকা আটকে আছে। এটা বাদ দিলে মোটের উপরে কিন্তু ঋণ খেলাপি খুব বেশি না। মূল সমস্যা হচ্ছে বড় শাখায় বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণগুলো আটকে আছে। তবে ঋণ আদায়ে নানারকম পদ্ধতি আছে। সুদ মওকুফ পদ্ধতি, পুনঃতফসিল পদ্ধতি এবং আরেকটা পদ্ধতি হলো মামলা।

সোনালী ব্যাংক এমডি জানান, মামলার ক্ষেত্রে যখন ক্ষুদ্র লোকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, তখন সফলতা আসে। এছাড়া টাকা আদায়ের হারও ভালো। কিন্তু যখন বড় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে যাওয়া হয়, তখন আমরা খুবই অসহায় হয়ে যাই। আমরা রিটের আশ্রয় নেই। তবে আমরা রিটের চাপ থেকে বের হতে পারি না। খেলাপি ঋণ থেকে বের হতে হলে রাষ্ট্রীকেই কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। আইনগত সহায়তা বাড়ানো যায় কিনা, আলাদা বেঞ্চ করা যায় কি না।’

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, আগে আদালতের রিট থাকা ঋণগুলো নিয়মিত দেখানো হতো। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে তা খেলাপি দেখানো হচ্ছে। এর ফলে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ ছাড়া আগে নিয়মিত করা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ এবং নতুন করে আরও এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের ডিএমডি এবং জিএমরা উপস্থিত ছিলেন।