সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন

সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী নারী গৃহকর্মী-শ্রমিক নির্যাতন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেবার দাবিতে আজ, শুক্রবার, ১ নভেম্বর, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মুক্তিফোরাম ও গণঐক্যের যৌথ উদ্যোগে একটি মানববন্ধন আয়োজন করা হয়। এখানে সুস্পষ্ট চুক্তির মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রতারক দালালগোষ্ঠীকে বিচারের আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্থ নারীদের ক্ষতিপূরণ দেয়া সহ নানা দাবি তুলে ধরা হয়।
গণ ঐক্যের আহ্বায়ক আরমন হোসেন পলাশের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি হাসনাত কাইয়ুম, মানবাধিকার কর্মী নায়মা ইমাম চৌধুরী, গণতান্ত্রিক সমাবেশের সমন্বয়ক নয়ন আহমেদ, লেখক রাখাল রাহা, সাবেক ছাত্রনেতা আবু তৈয়ব হাবিলদার, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের মোঃ তারেক রহমান, মুক্তিফোরাম মিডিয়ার সম্পাদক অনুপম দেবাশীষ রায় সহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মুক্তিফোরামের আরাফ ইবনে সাইফ।

বক্তারা প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা বিধানে সরকারের ঘাটতিগুলোকে তুলে ধরেন এবং এগুলোর সংশোধন করে প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা বিধান করার দাবি তোলেন। একই সাথে বিদেশী দূতাবাসগুলোকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধানে জোরদার ভূমিকা রাখার দাবি করা হয় এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী এবং প্রবাসীদের হয়রানি ও অবমাননাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি তোলা হয়।
সর্বশেষে মুক্তিফোরামের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দাবি পাঠ করেন আসিফ ইমরান। দাবিগুলো হলোঃ ১। ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়া সত্ত্বেও রেমিটেন্সের লোভে স্রেফ সমঝোতার ভিত্তিতে সরকারের যারা বাংলাদেশী নারীদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
২। নারী শ্রমিকদের উপর নির্যাতন ও ধর্ষণের খবর জানা স্বত্ত্বেও দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ের যেসব কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৩। সৌদি মালিকের নির্যাতনে মৃত্যু এবং আত্মহত্যার শিকার নারী-শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ন্যূনতম ২ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৪। সৌদি থেকে নির্যাতিত হয়ে স্বদেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া নারীদেরকে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রতি ন্যূনতম ১ কোটি টাকা প্রদান করতে হবে।
৫। যেসমস্ত নারী সৌদি আরবে নির্যাতন-নিপীড়নে শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, তাদেরকে সরকারের নিজদায়িত্বে দেশে ফেরত আনতে হবে এবং ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
৬। নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী হিসেবে অভিযুক্ত সৌদি নাগরিকদের বিচারের আওতায় আনতে সৌদি সরকারকে চাপ দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৭। সৌদি আরবে শ্রমিক হিসাবে নির্যাতিত নারীর মামলা করার প্রক্রিয়া সহজ ও মানবিক করতে সৌদি সরকারকে চাপ দিতে হবে। মামলা নিস্পত্তি হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে সৌদিতে থাকার বাধ্যবাধকতা বাতিল করতে হবে।
৮। নির্যাতনের মুখে দেশে ফেরার প্রচলিত নিয়মানুসারে ‘নিয়োগকর্তা তাঁর সঙ্গে কোনো খারাপ আচরণ বা শর্ত ভঙ্গ করেনি’ মর্মে লিখিত বিবরণী দেয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করতে সৌদি সরকারকে চাপ দিতে হবে।
৯। নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিবার জায়গা দিতে না চাইলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এবং এজন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন প্রণয়ন করতে হবে।
১০। সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো অর্থ লেনদেনের শর্ত না থাকা সত্ত্বেও যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি নারী শ্রমিকদের কাছ থেকে টাকাপয়সা নিয়ে থাকে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
১১। অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মধ্যস্বত্ত্বভোগী রিক্রুটিং এজেন্সি, যারা নারী শ্রমিকদেরকে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
১২। রিক্রুটিং এজেন্সি কর্তৃক সংশ্লিষ্ট নারী শ্রমিকের দায়দায়িত্ব ৩ মাসের বদলে পুরুষ শ্রমিকদের মতোই ২ বছর করতে হবে।
১৩। কোনো সমঝোতা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে নয়, সরাসরি আইনী প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ চুক্তির মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাতে হবে। চুক্তিতে শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রক্তের মতো সর্বগুরুত্ববহ উপাদানের ভূমিকা রেখে চলেছে রেমিটেন্স নামক যে প্রবাসী শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামের অবদান, সেই অবদানকে সম্মান জানানো মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষের কর্তব্য জ্ঞান করতে হবে। এবং প্রবাসী শ্রমিকদের, বিশেষত নারী শ্রমিকদের ওপরে চলমান বাস্তবতা নিরসনে যদি সরকার সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না রাখে তাহলে তারা সমাজদেশের সর্বস্তরে ধিক্কৃত হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি