সূচনা তৃতীয় লিঙ্গ হলেও মানুষ

প্রচ্ছদ:

অামার পাশের সিটে যে বসে অাছে,তার নাম সূচনা। দেখতে শুনতে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হলেও অামাদের সমাজে তার একটা অালাদা পরিচয় অাছে—সে তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ, অামরা যাদেরকে ‘হিজড়া’ বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করি সবসময়।

তিনদিনের ছোট্ট ছুটি কাটিয়ে পাবনা থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। অামার সিট মাঝের দিকে। প্রথমে তেমন খেয়াল না করলেও একটু পরে টের পেলাম কিছু একটা নিয়ে সামনের মানুষদের ভেতরে মৃদু হাসিতামাশা চলছে। ভালমতো খেয়াল করে দেখলাম সামনের দিকে বি-১ সিটে একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অাছেন, তাকে কেন্দ্র করেই সবার ভেতরে চাপা উত্তেজনা। তার পাশের সিট অর্থাৎ বি-২ এ কেউ বসতে চাচ্ছে না। গাড়ীর সব সিট ফিলঅাপ থাকায় বিকল্প কোন সিটে গিয়েও কেউ বসার জায়গা পাচ্ছিলো না,অার জার্নিটা মোটামুটি অনেক বড় হওয়ায় দাঁড়িয়ে পুরো রাস্তা যাওয়ার ইচ্ছাও নাই কারো। সূচনার কাছে গাড়ীর টিকিট বিক্রি করায় গাড়ীর সুপারভাইজারের সাথে কথা কাটাকাটি করছিল সামনের কয়েকজন।

সূচনা তৃতীয় লিঙ্গের একজন, এই হল তার অপরাধ। যেনতেন অপরাধ নয়,একেবারে অমার্জনীয় অপরাধ।তার পাশে গিয়ে বসা মানে একেবারে জাত চলে যাওয়া কাজ! অতএব, কেউই নিজেদের সম্মান বিসর্জন দিতে প্রস্তুত নয়।
……………অতঃপর অামি অামার নিজের সিট অন্যের কাছে ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে বসলাম সূচনার পাশে। সামনের প্রায় সবাই মুচকি মুচকি হাসছে।

একসময় এদেরকে দেখলে অামারও কেমন কেমন লাগতো। ধীরে ধীরে সেই সকল সংকীর্ণতাকে ঝেরে ফেলতে চেষ্টা করেছি। অামার জন্মের ওপর অামার যেমন কোন হাত নেই,তেমনি তার জন্মের ওপর তারও কোন হাত নেই, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই তারা এমন। তার জায়গায় তো অামাদের যে কেউই থাকতে পারতো! তবুও অামরা তাদেরকে অামাদের সমতলে ভাবতে নারাজ!

হতে পারে সূচনা তৃতীয় লিঙ্গের। কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব যে অনেকের চেয়ে অালাদা,সেটা কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললে বুঝতে একদম কষ্ট হয় না। বাসে সে টিকেটের পুরো টাকা পরিশোধ করেই উঠেছে, কারো দয়ার বশবর্তী হয়ে নয়। সে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে একসময় টাকা তুলে বেরালেও এখন সে একটি সংস্থার মাধ্যমে সেলাইয়ের কাজ করে।

গল্প করতে করতে একসময় যথেষ্ট অাবেগপ্রবণ হয়ে শৈশবের স্মৃতিচারণে চলে গেল সে। মোট সাত ভাই-বোন তারা। ৮/৯ বছর বয়সে যখন সবাই বুঝতে শুরু করল যে সে সাধারণের চেয়ে একটু অালাদা, ক্রমেই পরিবারের বাইরে এক কান,দুই কান হতে হতে ছড়িয়ে পরলো চারদিক। ভাগ্যের পরিহাসে এরপর ছাড়তে হল পরিবার-পরিজন, এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমালো সে এবং এখনও অাছে প্রাণহীণ এই শহরেরই এককোণে। বাবা-মা বেশ অাগেই গত হয়েছে তার। গ্রামের বাড়িতে কদাচিৎ যাওয়া-অাসা হয় তার। পাড়াপড়শিরা নাকি হাসাহাসি করে,অাত্মীয়-স্বজনরাও ইতঃস্তত বোধ করে।কিন্তু রক্তের টানে যখন অাপনজনদের খুব বেশি দেখতে ইচ্ছা হয়, তখন সবকিছু উপেক্ষা করে ক্ষণিকের জন্য সে ফিরে যায় ভিটেবাড়ীতে। নিজে কাজ করে যে টাকা পান, সেখান থেকে অভাবী ভাইদেরকেও কিছু কিছু করে দেওয়ার চেষ্টা করে সে।

পাশে বসে গল্প করতে করতে তাদের জীবন সম্পর্কে এরকম অারও অনেক কিছুই জানার সুযোগ হল।

হ্যাঁ,মানছি, তাদের চাঁদাবাজির অত্যাচারে সবাই জর্জরিত। কিন্তু দোষটা কিন্তু অামাদেরই। তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারি নি জন্যই তো তাদের এমন কিছু করতে হয়। অামাদের মত তাদেরও তো পেট অাছে, অামাদের মত তাদেরও অন্নবস্ত্রের চাহিদা অাছে৷ সেগুলো তো নিশ্চয়ই অাসমান থেকে নাজিল হয় না!

অামাদের সমাজে অামরা কতজনকেই তো মেনে নেই! সমাজে যারা যত বড় চোর,তাদেরকে অামরা ততবেশি সম্মান দেই।তাদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি সেলফি তুলতে পারলে নিজেদেরকে ধন্য মনে করি। অামাদের সমাজে অামরা চোর,মাস্তান, কালোবাজারি, মাদক ব্যবসায়ী, ঘুষখোর, ধর্ষকদের জায়গা দিতে পেরেছি,কিন্তু সেই সমাজে জায়গা হয়নি সূচনাদের মত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের!

পাশে বসে ওদের গল্পগুলো শুনতে শুনতে নিজেকে অনেক বেশি অপরাধী মনে হচ্ছিল। অামরা হয়তো কেউ পুরুষ হতে পেরেছি, কেউ নারী হতে পেরেছি,কেউ মুসলিম হয়েছি,কেউ বা হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ, কিন্তু মানুষ হয়তো কেউই হতে পারি নি! পারি নি বলেই এক স্রষ্টার সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও অামরা সূচনাদের মেনে নিতে পারিনি অামাদের সভ্য সমাজে!

(অনুমতি নিয়েই ছবিটি তুলেছি তার। টাইমলাইনে তো কতভাবে কতজনেরই ছবি থাকে,সেখানে থাক না সূচনাদের মত মানুষের ছবি। তাদেরকে ঘৃণা অার অবজ্ঞার অাস্তাকুর থেকে তুলে মানুষের সমাজে ঠাঁই করে দেওয়ার দায়িত্বটা তো অামাদেরই,নাহ?)

লিখনে:সাঈদ আবদুল্লাহ