সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় শিক্ষক লাঞ্চিত হওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে হামলা,ভাংচুর আহত ২০

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি::সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় স্থানীয় এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের হাতে জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক খান লাঞ্চিত হওয়ার প্রতিবাদে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন কর্মসূচিতে হামলা চালিয়ে ২০ শিক্ষার্থীকে আহত করেছে সন্ত্রাসীরা।
এসময় তারা জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামীলীগের জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি আলমগীর কবীরের বাসভবনেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে। আহত শিক্ষার্থীদেরকে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো উপজেলা সদরের মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়লে বাজারের ব্যাবসায়ীরা প্রায় ২ ঘন্টা তাদের দোকান-পাট বন্ধ রাখেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
জানাযায়,মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে ২০-২৫ জন সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আকস্মিকভাবে তাদের উপর এ হামলার ঘটনাটি ঘটায়।
জানা গেছে, ২৬শে মার্চ মহান স্বাধনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে সোমবার সকাল থেকে স্থানীয় জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নানান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্টানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। অনুষ্ঠানের ২য় পর্বে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয়ার পরপরই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন হঠাৎ করে মঞ্চ থেকে নেমে বিদ্যালয়ের পাশের সড়কে দাঁড়িয়ে জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক খানকে মঞ্চ থেকে ডেকে এনে তাকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে প্রকাশ্যে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি ওই প্রধান শিক্ষককে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হাড়-গুড়ো করে ভেঙে দিবেন বলেও হুমকি দেন। এ সময় উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষাথীসহ এলাকার শত-শত লোক উপস্থিত ছিলেন।
এ খবরটি সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সর্বস্তরের মানুষ এঘটনার নিন্দা জানান। পাশাপাশি এ ঘটনার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ এলাকার সর্ব-স্তরের লোকজন বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে দাঁড়িয়ে প্রতিকী প্রতিবাদ জানান এবং এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা দেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে জনতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্যাতিত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক খান বলেন, আমাদের এ বিদ্যালয়টি উপজেলা সদরে অবস্থিত এবং এটি ফলাফলের দিক দিয়েও উপজেলায় শীর্ষে অবস্থান করায় সরকার ওই বিদ্যালয়টিকে গত ২০১৪ সালে সরকারী করণের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু মাননীয় সাংসদ আমাদের ওই বিদ্যালয়টিকে সরকারী করণ না করার পক্ষে অবস্থান নেন এবং তিনি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে তাঁর নিজ এলাকায় অবস্থিত বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারী করণ করার জন্য একটি ডিও লেটার দেন। কিন্তু এমপি মহোদয়ের দেয়া ওই ডিও লেটারটিকে চেলেঞ্জ করে আব্দুল মন্নাফ নামে আমাদের বিদ্যালয়ের এক ছাত্রের অভিভাবক হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। এর পর থেকেই এমপি মহোদয় আমিসহ আমার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি বৈরী আচরন করে আসছেন। ওই শিক্ষক আরো বলেন, আমার বিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থীর দাবির প্রেক্ষিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয় সংলগ্ন স্থানে একটি ক্যান্টিন নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং ওই ক্যান্টিনটি এখানে নির্মান না করার জন্য এমপি মহোদয় আমাকে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান থেকে ডেকে এনে শত-শত মানুষের উপস্থিতিতে এভাবে অপমান অপদস্ত না করলেও পারতেন এবং আজ আমাদের শিক্ষার্থীদের শান্তি পূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উপর এভাবে হামলা করে আহত করাটা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামীলীগের জৈষ্ঠ্য সহ-সভাপতি আলমগীর কবীর বলেন, আমাদের এমপি সাহেব এমন একটি অনুষ্ঠান থেকে ডেকে এনে উপজেলার সুনামধন্য এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এভাবে লাঞ্চিত করেই তিনি ক্ষান্ত হননি। আজ তিনি তাঁর লালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালিয়ে তাদেরকে আহত করাসহ তাঁর সন্ত্রাসীরা আমার বাসভবনে হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার ছবিসহ ভেতরে থাকা সকল আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমি এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিন্দাসহ এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, উপজেলার সুনামধন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে একজন সাংসদ এভাবে প্রকাশ্যে লাঞ্চিত করাসহ তাঁরই ইশারায় আজ সন্ত্রাসীরা ছাত্র-ছাত্রীদের উপর হামলা চালানো ও আমাদের সিনিয়র সহ-সভাপতির বাসভবনে ভাংচুর করাটা খুবই দুঃখজনক। এমপি সাহেব ও তাঁর লোকজনের এ ধরনের কর্মকান্ডে এলাকাবাসীর কাছে আমাদেরকে দলীয়ভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। এমনকি এলাকায় তাঁর এ ধরনের কর্মকান্ড অব্যাহত থাকলে আগামী নির্বাচনে জনগণ আমাদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেবে।
আওয়ামীলীগ নেতার বাসভবনে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে স্বীকার করে ধর্মপাশা থানার ওসি সুরঞ্জিত তালুকদার বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে একটি রাজনৈতিক বিষয়। তবে আমরা এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছি এবং এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার বলেন, এ বিষয়টি দ্রুত মীমাংসা করার জন্য আজ বিকেলেই উপজেলার সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে একটি মিটিংয়ের আহবান করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ব্যবহৃত ০১৭১১৯১০১৯২ নম্বর মোবাইল ফোনে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি ।

Inline
Inline