সাতক্ষীরার ৩৯ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব তদন্ত শুরু

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা : সাতক্ষীরার ৩৯ জন ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশে ব্যাংক। বিষয়টি তদন্ত করতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল সোমবার সাতক্ষীরাতে পৌঁছেছে। তালিকাভূক্ত ৩৯ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব তদন্ত শুরু করেছেন তারা। তাদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক বলে জানা গেছে।

জানা যায়, তিন সদস্যের ওই তদন্ত দলে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-পরিচালক গাজী মনিরুদ্দীন, উপ-পরিচালক সালেহ উদ্দীন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. এম ডি বাশিরুল আলম।

ওই তদন্ত দল প্রথম দিনে ইললামী ব্যাংক লিমিটেড সাতক্ষীরা শাখায় তদন্ত শুরু করেছেন। ওই তালিকার মধ্যে অন্তত ১০ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব রয়েছে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের সাতক্ষীরা শাখায়। বাকীদের অন্যান্য ব্যাংকে হিসাব রয়েছে।

এসব ব্যাংক হিসাবে কী ধরণের লেনদেন হয়েছে। এসব টাকা কোথা থেকে হিসাবে জমা হয়েছে। কী পরিমান টাকা লেনদেন হয়েছে তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত দল। তালিকাভূক্তদের বিরুদ্ধে ভারতে হুন্ডির টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, যাদের ব্যাংক হিসাব তদন্ত করা হচ্ছে তাদের অনেকেই অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। বিলাসবহুল গাড়ি ও বাড়িরও মালিক হয়েছেন তারা। তারা বর্তমানে বৈধ ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ভারতেও তাদের রয়েছে বাড়ি-গাড়ি, অঢেল সম্পদ। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা বিভাগ অবৈধ এসব টাকার উৎস খুঁজতে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠানো তালিকাভূক্ত ৩৯ ব্যবসায়ীর মধ্যে রয়েছে সাতক্ষীরার জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকার জুয়েলার্স মালিক, ভোমরার একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী, কয়েক জন গরু ব্যবসায়ী, কয়েক জন বর্তমান ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও একজন জেলা পরিষদ সদস্য।

সাতক্ষীরার যেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব তদন্ত করে দেখা হচ্ছে তারা হলেন, সাতক্ষীরা জেলা শহরের খান মার্কেটের অংকন জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী গৌর দত্ত, অমিত জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী জয়দেব দত্ত, তালার কুমিরার আদিত্য মজুমদার, ব্রাদার্স জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী আশুতোষ দে, আলিপুরের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, জনপ্রিয় জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী সুমন কর্মকার ও বাবু কর্মকার, শ্যামনগরের নকীপুরের বিশ্বজিৎ মন্ডল, সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম মোর্শেদ, শ্রী জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী দীন বন্ধু মিত্র, ঝাউডাঙ্গার এম ভি জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী মুকুন্দ ভারতী, ঝাউডাঙ্গার সাগর জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী রবিন্দ্র নাথ দে, আশাশুনির নিউ দে জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী দেব কুমার দে, কলারোয়ার সন্ধ্যা জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী হরেন্দ্র নাথ রায়, আধুনিক জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী গোপাল চন্দ্র দে, তালার দীপা জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী গনেশ চন্দ্র শীল, তালার নিউ জুয়েলার্সের সত্ত্বাধিকারী বাসুদেব দত্ত, সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বৈকারীর রাশেদুল ইসলাম, পদ্মশাখরার লিয়াকত হোসেন, ঘোনার হাবিবুর রহমান, কলারোয়ার বলিয়ানপুরের জালালউদ্দিন গাজী, কলারোয়ার চন্দ্রনপুরের গরু ব্যবসায়ী নাসির, একই উপজেলার কাকডাঙ্গার গরু ব্যবসায়ী ইয়ার আলী মেম্বার, ভোমরা সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি কাজী নওশাদ দিলওয়ার রাজু, সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ সদস্য আল ফেরদৌস আলফা, বৈকারীর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান অসলে, ভোমরার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইসরাইল গাজী, কলারোয়ার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম, সাতক্ষীরা জেলা শহরের রয়েল স্যানেটারির সত্ত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম, ভোমরার এ এস ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী আজিজুল ইসলাম, বাঁকালের ফিরোজ ইন্টারপ্রাইজ এর সত্ত্বাধিকারী ফিরোজ হোসেন, বাঁকালের কে হাসান ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী খালিদ কামাল, ভোমরার মামা-ভাগ্নে ভান্ডারের সত্ত্বাধিকারী আজহারুল ইসলাম, মেসার্স কাজী ইন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী কাজী নওশাদ দিলওয়ার রাজু, মেসার্স সুলতান ইন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী ইসরাইল গাজী, মেসার্স সাব্বির ইন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী শাহানুর ইসলাম শাহিন, মেসার্স নাজিম ইন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী গোলাম ফারুক বাবু (দেবহাটার পারুলিয়ার সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান), মেসার্স রিজু এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আবু মুসা এবং মেসার্স রোহিত ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংক ব্যবস্থাপক জানান, গত সপ্তাহে ৩৯ জনের এই তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন ব্যাংকে পাঠানো হয়। এসব ব্যসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক। এসব ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যেকোন সময় বাংলাদেশের ব্যাংকের তদন্ত দল সরেজমিনে তালিকাভূক্তদের ব্যাংক হিসাব তদন্ত করবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত টিম সাতক্ষীরা পৌঁছেছে। সোমবার সকাল থেকে তদন্ত কাজ শুরু করেছেন তারা। তবে তদন্তকারী ওই দলের সদস্যদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকে হুন্ডির টাকা পাচারকারীদের একটি তালিকা সম্বলিত সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখিত সাতক্ষীরার ওই ৩৯ জন ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ ছিল।

Inline
Inline