সাকিব রিয়াদের অবিশ্বাস্য জোড়া সেঞ্চুরিতে কার্ডিফে ফের ইতিহাস

ইংল্যান্ডের মতো কঠিন কন্ডিশন। মাত্র ৩৩ রান চার উইকেট নেই। এরপরও যারা শক্তিশালী বোলিংয়ের বিপক্ষে ২৬৫ রান তাড়া করে জিততে পারে, তারা নিশ্চিত বড় দল। ২০০৫ সালের পর কার্ডিফে আবার ইতিহাস সৃষ্টি করলো বাংলাদেশ। সাকিব ও রিয়াদের অবিশ্বাস্য জোড়া সেঞ্চুরিতে নিউজিল্যান্ডকে ৫ উইকেটে হারিয়ে নতুন নজির সৃষ্টি করলো বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শেষ চারের সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখল টাইগাররা।

২৬৬ রানের লক্ষ্য। উইকেট স্পোর্টিং। মানে রানও ছিল এই উইকেটে। কিন্তু শুরুতে বল করতে ত্রাসের সৃষ্টি করলেন টিম সাউদি। অসাধারণ সুয়িং করালেন বলে, যার ছিটেফোকা পারেনি বাংলাদেশি পেসাররা।তামিমের আউটেই ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা । অনেক দিন ধরেই দলের ব্যাটিং অতি তামিম নির্ভর হয়ে পড়েছে।

প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই তামিমকে (০) এলবির ফাঁদে ফেলেন টিম সাউদি। তামিম নেই। এই আতঙ্কে হয়তো পেয়ে বসে সৌম্য, সাব্বির এবং মুশফিককে। পরপর আউট হয়ে দলকে মহাবিপদে ফেলে যান তারা। সৌম্য তো অনেক দিন ধরেই রানে নেই। এদিনও আত্মবিশ্বাসের চরম অভাব দেখা গেল। খেলতেই পারছিলেন না। ১৩ বলে এদিন মাত্র ৩ রান করতে ফিরলেন তিনি। সাব্বির শুরুতে দুটো চার মেরে জেগে ওঠার ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু নিভতেও সময় লাগলো না। ৮ রান করে ফিরলেন সাউদির বলেই।

এরপর মুশফিক ১৪ রানে আউট হয়ে গেলে মহাবিপদে বাংলাদেশ। যাকে বলে ব্যাটিং বিপর্যয়। ৩৩ রানে নেই চার উইকেট। ভয়াবহ! দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১৮২ রানে অলঅউট হয়েছিল টাইগাররা। আজ কতদূর? আজ কী তাহলে আরেকটা লজ্জা?

যেভাবে তরতর করে চার উইকেট পড়ে গেল তাতে মনে হওয়ার কথা উইকেট ব্যাটসম্যানদের জন্য মোটেও সহজ নয়। কিন্তু বাস্তবে যে তা নয়, সেটা তো নিউজিল্যান্ডই প্রমাণ প্রথমে ব্যাট করে। এবার প্রমাণ করলেন সাকিব ও মাহমুদউল্লাহ।

উইকেট খুব কঠিন নয়, সেটা দেখিয়ে দিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন তারা। কিন্তু ম্যাচের বারটা তো আগেই বাজিয়ে গেছেন চার ব্যাটসম্যান, ১১.৪ ওভারে মাত্র ৩৩ রান তুলে। রান রেটও যদি ঠিক রেখে আউট হতেন! মানে ১১.৩ ওভারে ৫৫-৬০ রান। তাহলে সাকিব- রিয়াদের উপর থেকে চাপ কমতো।

কঠিন দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে।বিপর্যয় সামাল দিতে হবে। রান রেট বাড়াতে হবে। এবং দলকে জয়ের কঠিন লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যেতে হবে। সে এক কঠিন লক্ষ্য। এই দায়িত্বটা যে এভাবে পালন করবেন তা ভাবতে পারেননি কেউ।

প্রথমে ব্যাটিং বিপর্যয় সামলে নিলেন। এরপর রান রেটে বাড়াতে মনোযোগ দিলেন। কোনো বোলিংই পাত্তা পেলো না সাকিব রিয়াদের কাছে। ৫০ রান থেকে ১০০ রানের পার্টনারশিপ। এরপর দেড়শ রান থেকে ছাড়িয়ে গেলেন দুইশ রানের পার্টনারশিপও। সে এক অবিশ্বাস্য ব্যাটিং। ভাঙলেন অসংখ্য রেকর্ড। থামলেন ২২৪ রানের পার্টনারশিপে।

পঞ্চম উইকেটে এর আগে সর্বোচ্চ রান ছিল ১৪৮। আর যেকোনো উইকেটে সবচেয়ে বেশি রান ছিল ১৭৮। সব রেকর্ড ভেঙ্গে এদিন নতুন শিখর পৌঁছালেন সাকিব –রিয়াদ।

সাকিব ক্যারিয়ারের সপ্তম সেঞ্চুরি পূরণ করেন ১১১ বলে। শেষ পর্যন্ত ১১৫ বলে ১১৪ রানের বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে এবং দলকে জয়ের এক হাত দুরে রেখে আউট হান সাকিব।সাকিবের আউট হবার পরপরই ১০৭ বলে ক্যারিয়ারের তৃতীয় শতক তুলে নেন রিয়াদ। অপরাজিত থেকেই ঐতিহাসিক জয় এনে দেন রিয়াদ। ১৬ বল বাকি থাককেই কঠিন লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।

সকালে টসে জিতে ব্যাট করতে নেমে ৮ উইকেটে ২৬৫ রান করে নিউজিল্যান্ড।ওভালের চেয়ে কার্ডিফের উইকেট একটু আলাদা।এখানকার উইকেটে হালকা ঘাস আছে, ওভালে যেটা ছিল না। গত কয়েকদিন ধরে এখানে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে এবং শুক্রবার সকালেও।পেসারদের এই উইকেটে ভালো করা উচিৎ ছিল। কিন্তু না, গত দুই ম্যাচের মতো এদিনও যন্ত্রণাময় বোলিং।

শুরুতে না পেলেও তাসকিন ও রুবেলের হাত ধরে ৬৯ রানে দুই উইকেট তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এটা থেকে অ্যাডভান্টেস আদায় করে নিতে পারেনি টাইগাররা।১৬ রান করে তাসকিনের বলে ফিরেন রনচি। ৩৩ রানে ওপেনার গাপটিলকে আউট করেন রুবেল হোসেন।

চার পেসার এক স্পিনার। স্পিনার বলতে সাকিব। কিন্তু অনেক দিন ধরেই তিনি উইকেটের বাইরে। ১৫, ২০, ২৫, ৩০ ওভারের দিকে স্পিনারদের দায়িত্ব থাকে দুই তিনটা উইকেট এনে দেওয়ার। কিন্তু আজও সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ সাকিব। সেই সুযোগে ধেই ধেই করে রান বাড়িয়ে নেন উইলিয়ামসন ও টেলর।

৩০তম ওভারে উইকেট একটা আসলো কিন্তু সেটা রান আউটের সুবাদে। মোসাদ্দেকের চমৎকার থ্রোর কল্যাণে। টানা তিন ম্যাচের হাফ সেঞ্চুরিয়ান কেন উইলিয়ামস ৫৭ রানে ফিরলে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে। কিন্তু এরপর আরেকটা পার্টনারশিপ। রস টেলরের সঙ্গে ব্রুম। ৪৯ রানে এ জুটি ভাঙেন তাসকিন। ৮২ বলে ৬৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে মোস্তাফিজের বলে ধরা পড়েন টেলর। নিউজিল্যান্ডের রান তখন ৩৮.৩ ওভারে ৪ উইকেটে ২০১।

শেষ দশ ওভার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কী ২৬০ রানে বাঁধতে পারবে, নাকি ৩০০ ছুঁবে কিউইরা? ৩০০ রানের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিলো তারা। তবে নিজের প্রথম ওভার বল করতে এসেই জাদু দেখান অনিয়মিত স্পিনার মোসাদ্দেক হোসেন। সাকিব কিছু করতে না পারলেও এক ওভারে দুই ব্যাটসম্যান ফিরিয়ে দিয়ে দলকে বড় বিপদ থেকে বাঁচান মোসাদ্দেক। প্রথমে ব্রুমকে ফেরান ৩৬ রানে। এরপর শূন্য রানে এলবি করেন কোরি অ্যান্ডারসনকে।

ভালো খেলছিলেন নিশাম। তাকে দ্রুত আউট করতে পারলেই হলো। এবং সেটাও করলেন এ তরুণ বোলার। ২৩ রানের নিশামকে আউট করে স্বস্তি এনে দেন মোসাদ্দেক। এরপর মিনলেকে ৬ রানে মোস্তাফিজ বিদায় করলে ২৬৫ রানে আটকে যায় নিউজিল্যান্ড। মাত্র ১৩ রানে ৩ উইকেট নেন মোসাদ্দেক।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

নিউজিল্যান্ড: ৫০ ওভার ২৬৫/৮ ( গাপটিল ৩৩, রনচি ১৬, উইলিয়ামসন ৫৭ , টেলর ৬৩, ব্রুম ৩৩, নিশাম ২৩, অ্যান্ডারসন ০, মিনলে ৬, সান্টনার ৭*; মাশরাফি ০/৪৫, মোস্তাফিজ ১/৫২, রুবেল ১/৬০, তাসকিন ১/৪৩ , সাকিব ০/৫২, মোসাদ্দেক ১/১৩)।

বাংলাদেশ: ৪৭.২ ওভারে ২৬৮/৫ ( তামিম ০, সৌম্য ৩, সাব্বির ৮, মুশফিক ১৪, সাকিব ১১৪ , মাহমুদউল্লাহ ১০২* , মোসাদ্দেক ৭* ; সাউদি ৩/৪৫, বোল্ট ১/৪৩)।

ফল: বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী।