সবচেয়ে বেশি সময় টানা দেশ শাসনে আ.লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের ইতিহাসে একটানা সর্বোচ্চ সময় ধরে টানা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সাল থেকে আজ শনিবার (২১ অক্টোবর) পর্যন্ত টানা আট বছর ৯ মাস ১৫ দিন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছে দলটি। আর কোন দল এতো সময় ধরে একটানা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত একক দল হিসেবে সর্বোচ্চ সময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে দলটি।

টানা সরকারে থাকার দ্বিতীয় রেকর্ডটি হচ্ছে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। তিনি আট বছর সাত মাস ১৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগের হাতেই প্রথম শাসনভার উঠে। এই দলের হাত দিয়েই রচিত হয় দেশের সংবিধান। দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে সরান হয় নৃশংসতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের ইতিও ঘটে রক্তাক্ত ও ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। এরপর নির্বাচন হলেও আবারও সামরিক শাসন চেপে বসে বাংলাদেশে। ১৯৮২ সালে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে রাষ্ট্রপতি হন আরেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও জিয়াউর রহমানের দেখানো পথে ক্ষমতায় থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন তার দল জাতীয় পার্টি। গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন ১৯৯০ সালের শেষে।

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে জিয়াউর রহমান পত্মী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। এর পর ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর চারটি নির্বাচনের তিনটিতেই জিতেছে আওয়ামী লীগ। প্রথমবার, ১৯৯৬ সালের জুনে, দ্বিতীয়বার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এবং সবশেষ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে।

২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মত শপথ নেন শেখ হাসিনা। আর ২০১৪ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন শেখ হাসিনা। তার শাসনামলেই আদালতের নির্দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর নির্বাচিত সরকারের অধীনেই হয় দশম সংসদ নির্বাচন। ফলে আওয়ামী লীগকে আর নির্বাচনকালীন সময়ে ক্ষমতা ছাড়তে হয়নি। তাই টানা শাসনের সুযোগ পেয়েছে দলটি।

দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মাঠ অবশ্য ছিল ফাঁকা। নির্বাচন বর্জন ও বানচালের ঘোষণা দিয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও সমমনারা আন্দোলনে থাকায় কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না আওয়ামী লীগের।

টানা প্রায় নয় বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটি দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দেশের জনগণ আগামী মেয়াদেও তাদের নির্বাচিত করবে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। আর এর মধ্য দিয়ে টানা ১৫ বছর দেশ শাসনের রেকর্ড গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা ২০০৮ সালে ‘দিন বদল’ এবং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্লোগান নিয়ে মানুষের কাছে ভোট চেয়েছি। মানুষ আমাদের সেই স্লোগানের ওপর আস্থা রেখে আমাদের ভোট দিয়েছিল। এরপর আমরা তাদের সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছি। দেশের মানুষের দিন বদল হয়েছে, তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে এবং তাদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য হলো ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি পরিপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করা। যেহেতু আমরা অতীতে আমাদের ওয়াদা রেখেছি, ভবিষ্যতেও আমাদের লক্ষ্য পূরণ করব। সেজন্য আমরা আশা করছি ফের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবে আওয়ামী লীগ।’

এরশাদের টানা আট বছর সাত মাস ১৫ দিন

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে রাষ্ট্রপতি ১৯৮৭ সালের ৭ ডিসেম্বর এই সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সব দল বয়কট করে। আর সম্মিলিত বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়েন এরশাদ।

স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ সময় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে সামরিক শাসন বা সামরিক শাসনের মোড়কে থাকা শাসনে টানা ১৬ বছর আওয়ামী লীগকে সংগ্রাম করতে হয়েছে রাজপথে। তারপরও স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া দলটিই।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগই। আর ২১ বছর পর তারা ক্ষমতায় ফেরে ১৯৯৬ সালে। তখন তারা দেশ শাসন করে পাঁচ বছর। সব মিলিয়ে ৪৬ বছরে আওয়ামী লীগ শাসন করেছে সাড়ে ১৭ বছরের মতো।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শাসন করেছে বিএনপি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের পর তিন বছর এবং এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর ও ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আর পাঁচ বছর দেশ শাসন করেছে তারা। সব মিলিয়ে তারা ক্ষমতায় ছিল সাড়ে ১৩ বছর।

আর জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ আট বছর সাত মাস ১৫ দিন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে ১৯৭৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কিছুদিন আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতক নেতা খন্দকার মোশতাক এবং বাকি সময় উর্দি পড়ে শাসন করেছেন জিয়াউর রহমান।

সরকারের প্রথম মেয়াদ পূর্তিতেও আওয়ামী লীগ

সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সরকারের মেয়াদ কাল পাঁচ বছর। তবে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তান আমলে তো বটেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ২৫ বছরেও কোনো সরকার তার মেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। ১৯৯৬ সালের জুনের জাতীয় নির্বাচনে জেতা আওয়ামী লীগই প্রথমবারের মতো তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

এর পরে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারও তার মেয়াদ পূরণ করে। একইভাবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেতার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারও তার মেয়াদ পূরণ করে।

প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের মুখে নির্বাচন করে বাংলাদেশে কোনো সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াতের বর্জনের মুখে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত পৌনে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়। আর তারা মেয়াদ পূরণ করেই নির্বাচন দেবে বলে জানিয়েছেন নেতারা।