শিক্ষায় এগোচ্ছে সিলেট

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া জনপদ হিসেবে পরিচিত সিলেটে প্রতিবছর বাড়ছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে পাসের হারও। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে একসময় স্কুলবিমুখ ছিল শিশুরা, এখন স্কুলগুলো ভরপুর। দিনে দিনে নানা উদ্যোগের কারণে বদলে যাচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষায় ক্রমেই এগোচ্ছে পাহাড়-টিলা, চা-বাগান, হাওর বেষ্টিত বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল।সিলেট শিক্ষা বোর্ডের গত পাঁচ বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এর ইতিবাচক চিত্র দেখা যায়।সর্বশেষ রবিবার প্রকাশিত ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। পাসের হারের দিক দিয়ে এবারের দেশসেরা শিক্ষা বোর্ড সিলেট।শিক্ষা বোর্ড গঠিত হওয়ার পর ২০১২ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় ৫৮ হাজার ৩৭৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। সে বছর পাসের হার ছিল ৯১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর ২০১৭ সালে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১৫। পাসের হার ৮০ দশমিক ২৬ শতাংশ।প্রথম এইচএসসিতে ২০১২ সালে ৩৭ হাজার ৩৭২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। সেবার পাস করেছিল ৮৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০১৭ সালে হয়েছে ৬৫ হাজার। এবার পাসের হার ৭২ শতাংশ।এই অঞ্চলের শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। ফলে এখনো জাতীয় গড় পর্যায় থেকে বেশে নিচে এর শিক্ষাসূচক।সম্প্রতি এডুকেশন ওয়াচ-এর এক গবেষণায় শিক্ষাক্ষেত্রে সিলেট বিভাগের অনগ্রসরতার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়।
ওই গবেষণায় বলা হয়, সিলেটের প্রাথমিক শিক্ষালাভের উপযুক্ত বয়সী শিশুদের ৮০.৫ শতাংশ, আর মাধ্যমিক শিক্ষালাভের উপযুক্ত বয়সী শিশুদের ৬৪.২ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হয়। দুটি হারই এ-সংক্রান্ত জাতীয় গড় হারের তুলনায় অনেক নিচে। জাতীয় গড় হার যথাক্রমে ৮৬.৪ ও ৭৭.৭ শতাংশ।স্কুলে পড়ালেখা করেছিল এমন জনসংখ্যার হার কিংবা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষালাভকারী জনসাধারণের হারের নিরিখেও সিলেট বিভাগের অবস্থান দেশের গড় অবস্থানের তুলনায় পেছনে। সাক্ষরতার হারের দিক থেকে সিলেটের অবস্থান সবার নিচে।সাত বছর কিংবা এর বেশি বয়সী সিলেটবাসীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৪০.৭ শতাংশ, আর এখানে বয়স্ক সাক্ষরতার হার ৪৪.৪ শতাংশ । এই হারগুলোর জাতীয় গড় যথাক্রমে ৪৮.৫ ও ৫২.১ শতাংশ। সিলেট বিভাগের ৩০.৪ শতাংশ খানায় একজনও সাক্ষর লোক নেই, যা পুরো দেশের ক্ষেত্রে ২১.৫ শতাংশ।গবেষণা মতে, অন্যান্য অঞ্চলের শিশুদের তুলনায় সিলেট বিভাগের শিশুরা স্কুলে ভর্তি হয় দেরিতে, আবার আগাম ঝরে পড়ার হারও তাদের মধ্যে বেশি। বয়সভিত্তিক নিট ভর্তি হারের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সিলেটের প্রতিটি বয়স গ্রুপের শিশুদের নিট ভর্তি হার এ-সংক্রান্ত জাতীয় গড় হারের চেয়ে কম। যেখানে বাংলাদেশের ছয় বছর বয়সী শিশুদের ৬৫ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হয়, সেখানে সিলেট বিভাগের একই বয়সী শিশুদের মধ্যে এই হার পাওয়া গেছে মাত্র ৫২ শতাংশ।তবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমাতে ও শিশুদের স্কুলমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন সিলেট প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাহমিনা খাতুন। তিনি বলেন, ধীরে ধীরে সিলেটে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে। সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে স্কুলমুখী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।সিলেট মেট্রোপিলটন ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা, ভৌগোলিক অবস্থান, পাহাড়, টিলা, হাওর, চা-বাগান পরিবেষ্টিত এ অঞ্চলে দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা। ফল শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে ছিল সিলেট। কিন্তু নানা উদ্যোগের ফলে এখন এসব সমস্যা ছাপিয়ে শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে সিলেট।’সাম্প্রতিক সময়ে এখানকার মানুষের বিদেশগামিতার প্রবণতা কিছুটা কমে আসছে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। এমনকি মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে।সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সামসুল ইসলাম বলেন, শিক্ষায় আর পিছিয়ে নেই সিলেট অঞ্চল। তরুণরা বিদেশমুখী অবস্থান থেকে ফিরে পড়ালেখায় মনোযোগী হয়েছে। আগে যেখানে স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভুগত, এখন জায়গা সংকুলান করতে হিমশিম খেতে হয়।
সামসুল বলেন, প্রাকৃতিক কারণে হাওর-পাহাড় ও চা-বাগান বেষ্টিত সিলেট অঞ্চলে শিক্ষার হার অনেক পিছিয়ে ছিল। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিশুরা স্কুলবিমুখ ছিল। দিনে দিনে নানা উদ্যোগের কারণে সে সমস্যা অনেকটা কমে আসছে।