রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘যাচ্ছেন’ মিয়ানমারের মন্ত্রী

নিজস্ব সংবাদদাতা : মিয়ানমারে হত্যা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ছুটে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে প্রথমবারের মতো কক্সবাজার যাচ্ছেন মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী। চলতি মাসে মিয়ানমার সরকারের ওই প্রতিনিধি ঢাকা হয়ে কক্সবাজার সফর করতে রাজি হয়েছেন।

সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে রোহিঙ্গা বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এ তথ্য জানান। তবে দেশটির কোন মন্ত্রী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাবেন, সেই তথ্য জানাননি তিনি।

‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট: স্থায়ী সমাধানের পথ’শীর্ষক দুই দিনের সেমিনারের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিস।

সেমিনারের দশটির মতো দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।

দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের তৈরি প্রতিবেদন, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্থাপিত পাঁচটি প্রস্তাবনা, চীনের প্রস্তাবিত তিনটি ধাপের সমাধান, মালয়েশিয়ায় প্রস্তাবিত ‘পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল ফাইন্ডিংস অ্যান্ড রিকমেন্ডেশন’ এবং ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট রেজু্ল্যুশন নিয়ে আলোচনা করা হবে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পর্যালোচনাপত্র ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে ‘ঢাকা ঘোষণা’ দেওয়া হবে। যেখানে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সুপারিশ তুলে ধরা হবে।

গত আগস্টে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খ শোয়েবাংলাদেশ সফর করেছেন। তবে তিনি কক্সবাজার যাননি। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ঢাকায় বসে আলোচনা শেষে ফিরে গেছেন নিজ দেশে। এই অবস্থায় মিয়ানমারের মন্ত্রী রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে গেলে তিনি নিজ চোখে তাদের দুর্দশা যেমন দেখতে পারবেন, তেমনি রোহিঙ্গারা তাকে পরিস্থিতি জানাতে পারবে।
রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না মিয়ানমার সরকার। আর সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে নানা সময় বাংলাদেশের দিকে ছুটে এসেছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা।

সব শেষ গত আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সরকারি বাহিনীর ওপর সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর সেনা অভিযানের নৃশংসতার মধ্যে বাংলাদেশে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। এদের সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এদের আশ্রয় হয়েছে কক্সবাজারে উখিয়া উপজেলায় আশ্রয় শিবিরে।

রোহিঙ্গাদের স্রোত শুরু হওয়ার পর বিষয়টি বাংলাদেশ তোলে জাতিসংঘে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও প্রথমে রোহিঙ্গা নির্যাতনের কথা স্বীকার না করলেও পরে ‘কিছু হত্যার’ বিষয়টি স্বীকার করেন দেশটির সেনা প্রধান।

আর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদেরকে ফিরিয়ে দিতে দেশটির সঙ্গে প্রথমে সমঝোতা স্মারক এবং পরে ফিজিক্যাল অ্যারাঞ্জমেন্ট নামে চুক্তিও হয়েছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বান্দরবান সীমান্তে দুই দেশের শূন্য রেখায় অবস্থানকারী আট হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকাও দেয়া হয় মিয়ানমারকে। কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদেরকে ফিরিয়ে না নিয়ে তালবাহানা করছে-এ কথা জানিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্পন্ন আশ্রয় প্রকল্প নির্মাণে সরকারকে বিপুল টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এখনো বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। তাদের নানা রকম ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, অত্যাচার করা হয়েছে তবুও তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি।’

সম্প্রতি দুই দেশের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত যৌথ কমিটি সেখানে পরিদর্শন করেছে জানিয়ে সচিব বলেন, ‘শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগের বাড়িঘর পুড়ে যায়নি। আমরা একটা একটি মেকানিজম তৈরি করার চেষ্টা করছি, যাতে করে তারা (রোহিঙ্গারা) ফেরত যেতে পারে।’
‘বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে’

রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ইস্যু নয়। এর সঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায় সম্পৃক্ত। এর টেকসই সমাধান না হলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে এর সমাধান করতে হবে।’

‘রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারকেই সেইফ জোন বা নিরাপত্তা বলয় করে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’

ভাসানচরে পুনর্বাসন প্রসঙ্গ

আনুমানিক এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পুনর্বাসন করার কথা বলছে সরকার। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরকারের কাছে অনেক বিকল্প আছে এবং ভাসানচর তার একটি।’

‘আমরা অপশনগুলো বিবেচনা করছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একবার বলছে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে যেখানে আছে সেটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। আবার তারাই বলছে, রোহিঙ্গাদের অন্য জায়গায় সরানো যাবে না।’

‘খানে (ভাসানচর) পুনর্বাসনের পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা হেলিকপ্টারে করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সেখানকার অবস্থা দেখানোর জন্য নিয়ে যাব।’