রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, ফেরত নিতেই হবে: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক : রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমারকে মানতে হবে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের নিজ বাসভূমে ফেরত নিতে হবে।একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা মিযানমারের সৃষ্টি। মিয়ানমারকেই এর সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ তাদের সহায়তা করবে।সোমবার রাতে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংসদে আলোচনা প্রস্তাবে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।এর আগে সন্ধ্যা সোয়া সাতটার দিকে জাতীয় সংসদে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রস্তাবটি তোলেন। প্রস্তাবটি হলো: ‘মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠেীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধ, তাদের নিজ বাসভূম থেকে বিতাড়ন করে বাংলাদেশে পুশ ইন করা থেকে বিরত থাকা এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার দিয়ে নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা গ্রহণে মিয়ানমার সরকারের ওপর জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানানো হোক এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর আগে বিকেল পাঁচটায় প্রশ্নোত্তর পর্বের মধ্য দিয়ে অধিবেশন শুরু হয়।মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর একটি গোষ্ঠীর হামলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন এমন পর‌্যায়ে গেছে, নদীতে লাশ ভেসে আসছে। শিশুর গুলিবিদ্ধ লাশ আসছে। বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে চুপ থাকি কীভাবে। আমাদেরও অভিজ্ঞতা আছে। একাত্তরের সেই দৃশ্য ভুলি কী করে। কিন্তু এত এত মানুষকে আশ্রয় দেয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন সে কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু এটা মানবিক ব্যাপার। আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি মানবিক কারণে। আমরা চায় তারা নিজ দেশে ফিরে যাকে। মিয়ানমারকে বলব, যারা তাদের নাগরিক, শত শত বছর ধরে আছে, হঠাৎ তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হলো, কেন এটা তারা করল। প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ক্ষমতা আসার পর ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমরা কাউকে আমাদের মাটি ব্যবহার করতে দেব না। আমরা তো আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা কাউকে আমাদের মাটি ব্যবহার করতে দিই না। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার হয়ে বারবার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৯১ সালে যারা এসেছিল তাদের প্রায় সবাই্কে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারপরও বেশ কিছু রোহিঙ্গা রয়ে গেছে। তাদের ফেরত দেয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করে হয়েছে। কিন্তু ফিরিয়ে নেয়া তো দূরের কথা ২০১২ সালে, ১৬ সালে আর ১৭ সালে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন যতবার মিয়ানমারের সরকারের সঙ্গে দেখা হয়েছে ততবার বলেছি, তারা যেন তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে ফেরত নিয়ে যায়্, কিন্ত ফেরত নেয়া তো দূরের কথা তারা আরো ঠেলে পাঠায়। এখন সারা বিশ্বের মানুষ সেটি দেখছে।সারা বিশ্বে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে নিজের পর‌্যবেক্ষণ সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী বলেন। তিনি বলেন, আমরা দেখছি, সমস্ত বিশ্বে মুসলমানের ওপর আক্রমণ করার প্রবণতা শুরু হয়েছে। মুসলমানরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকত, তা হলে এই আক্রমণ করার সাহস পেত না্ কেউ। কিন্তু দুর্ভাগ্য এ রকমই ঘটে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন মিয়ানমার থেকে নির‌্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে আসছে। মানবিক কারণে জায়গা দিচ্ছি। এত লোক আসছে, ছোট ছোট শিশুরা, এদের কোথায় জায়গা দেব।প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, মিয়ানমারকে মানতে হবে রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক। এক জেনারেল ঘোষণা দিয়েছেন তারা বাঙালি। বাঙালি তো সারা বিশ্ব আছে। রোহিঙ্গারা শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করছে। কেন তাদের হত্যা নির্যাতন করছে।একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রাখাইনে বিভিন্ন গোষ্ঠার হামলার প্রতিও উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যারা সেখানে পুলিশ মারছে তারা কী অর্জন করছে। তারা কি জানে না তাদের এই কাজ সাধারণ মানুষের ওপর নির‌্যাতনের সুযোগ করে দিচ্ছে। শিশুদের হত্যার সুযোগ করে দিচ্ছে। তাদের সন্ত্রাসী কাজের কারণে মিয়ানমারের লোকজন কষ্ট করছে। আমরা তাদের (সন্ত্রাসী গোষ্ঠী) প্রশ্রয় দেব না। কিন্তু মিয়ানমার সরকার কেন কিছু মানুষের অপরাধের কারণে সাধারণ মানুষকে নির‌্যাতন করবে, শিশুদের হত্যা করবে?এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোয় একসময়ের উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা কথা তুলে ধরে বলেন, সেখানে সাধারণ মানুষকে কোনো রকম হয়রানি করা হয়নি। বরং যারা ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের ফিরিয়ে এনেছি। আমার দেশের নাগরিক কেন অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে। তাদের নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কফি আনানের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আগে থেকে দীর্ঘদিন ধরে যারা আছে এবং নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে।রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমার সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন এ্ সমস্যা তারা সৃষ্টি করেছে তাদের সমাধান করতে হবে। প্রয়োজেনে আমাদের সহযোগিতা লাগলে আমরা দেব। তবে কেউ যাতে রোহিঙ্গা নিয়ে রাজনীতি না করে সে ব্যাপারেও সতর্ক করে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৭ কোটি মানুষের দায়িত্ব পালন করি। ৫-৬ লাখ লোকেরও খাবার দিতে পারব। কেউ সাহায্য দিতে চাইলে তা দিতে পারবে। কিন্তু কেউ যেন এ নিয়ে রাজনীতি না করেন। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি এবারের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরা হবে বলে সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।