রাজধানীতে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন!

আগুন লাগলে অভিযান, কয়েকদিন গেলে সব শেষ! এভাবেই যুগ যুগ ধরে চলছে রাজধানীর পুরানো ঢাকায় কেমিক্যাল গোডউনগুলো। এক ধরনের চোর-পুলিশ খেলা চলে এই গুদামগুলো ঘিরে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক হিসেবে দেখা গেছে, পুরানো ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক দাহ্য বস্তুর গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলে এখানে। যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শঙ্কার কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস।

বিস্ফোরক অধিদফতরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্যের অনুমোদন দেই। পুরানো ঢাকায় আমাদের অনুমোদিত কোনো গুদাম নেই। যেগুলো আছে সেগুলো সবই অবৈধ।’ সবার চোখের সামনে দিনের পর দিন এগুলো কিভাবে চলছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাঝে মধ্যেই সিটি করপোরেশন- জেলা প্রশাসন সেখানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। অবৈধ গুদামগুলো সিলগালা করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। অনেককে জেলেও পাঠানো হচ্ছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করি।’

পুরানো ঢাকার বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহূত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে। প্রকাশ্যে এসব গুদাম থেকে কেমিক্যাল আনা-নেওয়া করছেন ব্যবসায়ীরা। সবার চোখের সামনে এই ঘটনাগুলো ঘটলেও দেখার কেউ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে আড়াই হাজারকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, সেটাও ঠিক হয়নি। কাকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে সে বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কর্তৃপক্ষ-গুদাম মালিক কেউই আইন মানছেন না।

২০১০ সালের ৩ জুন পুরানো ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এছাড়া দগ্ধ হয়েছে আরো শতাধিক মানুষ। এ ঘটনার পর নিমতলী থেকে কিছু গুদাম ও কারখানা সরানো হলেও পুরানো ঢাকার অন্য এলাকা থেকে খুব বেশি সরেনি। বরং এই গুদামগুলো অন্য এলাকায় স্থানান্তর হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা অভিযান চালাচ্ছি, জেল-জরিমানা হচ্ছে; কিন্তু এগুলো বন্ধ হচ্ছে না। অভিযান চালিয়ে চলে আসার পর আবার তারা বসে যাচ্ছে; কিন্তু প্রতিদিন তো সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আপনারাই পরামর্শ দেন- কি করলে এগুলো বন্ধ করা যাবে? আমরা আপনাদের কাছেও পরামর্শ চাই। দক্ষিণের মেয়র সত্যিই আন্তরিক এগুলো বন্ধ করার ব্যাপারে; কিন্তু কোনো পথ পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ ভালো পরামর্শ দিলে আমরা সেগুলো গ্রহণ করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’

পুরানো ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ ভয়ংকর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ফলে পুরানো ঢাকার মানুষ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন। গত কয়েক বছরে রাসায়নিক সংশ্লিষ্ট কারণে রাজধানীতে যতগুলো অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার সব কটিই ঘটেছে পুরানো ঢাকায়। এসব আগুনে মারাও যাচ্ছে মানুষ।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড স্মরণকালের ভয়াবহতম ঘটনা। এই ঘটনার পরেও পুরানো ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডজনিত প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিন সেখানকার কোনো না কোনো রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে কর্মরত শ্রমিকরা দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে আসছেন। কেমিক্যালে পোড়া রোগী বাঁচানো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে।’

সর্বশেষ অভিযান চালানোর সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপদ নগরী গড়ে তুলতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এ লক্ষ্যেই পুরানো ঢাকার রাসায়নিক গুদাম অপসারণের জন্য আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তিনি বলেন, কিছু রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা বিপজ্জনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নিমতলীর ঘটনার পর সরকার এসব গুদাম সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিলেও বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই তা মানেনি। এগুলো অপসারণ অভিযানে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা এগুলো সরাবোই।

ফায়ার সার্ভিস আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, চকবাজার, কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, ইসলামপুরসহ আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রস্তুত করেছে। এসব গুদাম ও কারখানার অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন নেই। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (ডিডি-অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। মাত্র দুই ভাগ গোডাউনের অনুমোদন রয়েছে। সেসব গোডাউন রয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপারে। তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস চাইলেও এসব গোডাউন উচ্ছেদ করতে পারে না। উচ্ছেদ করতে হলে পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও বিস্ফোরক পরিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।

২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীর চর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য বিসিকের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে আরেকটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কমিটিগুলো কাজই শুরু করতে পারেনি।

Inline
Inline