যে কারণে নতুন কাঠামোতে নির্ধারণ হল না শিক্ষকদের বেতন

teacherনিজস্ব প্রতিবেদকঃ অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদনে সরকারি চাকরিজীবীরা আনন্দে মিষ্টি বিরণ করলেও আন্দোলন মঞ্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ ও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিতে অনেকদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। আর সেই আন্দোলনই কাল হয়েছে শিক্ষকদের। কারণ স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর আন্দোলনের জন্যই নাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নির্ধারাণ করা হয়নি।

একই সঙ্গে এমপিওভূক্ত (মানথলি পেমেন্ট অর্ডার) শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও বেতন কাঠামো নির্ধারাণ করা হয়নি অন্য এক কারণ দেখিয়ে। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে বেতন আদায়সহ স্কুলের যে আয় হয় সে অর্থ সরকারকে না দেয়ায় শিক্ষক-শিক্ষাদের নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের বিষয়টি ঝুলে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এমপিওভূক্ত কর্মচারীদের সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেছেন, ‘নতুন বেতন স্কেল তাদের জন্য কার্যকর হবে। তবে তাদের বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করবে তারপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ এরপর অর্থবিভাগ পরিপত্র জারি করবে।’

তিনি বলেন, ‘পর্যালোচনা হলেও তাদের জন্যও নতুন স্কেল কার্যকর হবে ১ জুলাই ২০১৫ থেকে।’

এদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন স্কেল সম্পর্কে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। তারা বেতন কাঠামোর বিষয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করবে বেতন বৈষম্য নিরশন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। আর এই পর্যালোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের গ্রেড অনুযায়ী নতুন স্কেলেই বেতন পাবেন।’

বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ ও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিতে প্রায় সাড়ে ৩ মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন সারাদেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত তাদের জন্য আশাব্যঞ্জক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে আন্দোলন আরো বড় পরিসরে নেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে শিক্ষক নেতাদের। সর্বশেষ গত চার রোববার বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের আহ্বানে তিন ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। আসছে মঙ্গলবার পূর্ণদিবস কর্মবিরতিরও ঘোষণা রয়েছে।
তারা আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছে মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন হলে তাৎক্ষণিক জাতীয় সম্মেলনের ডাক দেয়া হবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে রিট করারও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

শিক্ষকদের আন্দোলনে সরকার এ পর্যন্ত কোনো সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ। এজন্যে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের আমলাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের কিছু আমলা ষড়যন্ত্র করে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছেন।’

অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের অর্থমন্ত্রী সকালে এক কথা বলেন, বিকেলে এক কথা বলেন। তার কথায় আমাদের আস্থা নেই। তিনি আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে আবার কানপড়া পেয়ে সব ভুলে গেছেন। তবে আমরা আগেও বলেছি, এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই। আসলে অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, কারণ তিনি তো আমলাদের লোক। উনি শিক্ষকদের সম্মান দিচ্ছেন না।’

শিক্ষক নেতারা বলছেন, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে শিক্ষকদের সচিব, পদায়িত সচিবের নিচে মূল্যয়ন করার পেছনে রয়েছে সরকারের ভিতর থাকা বড় বড় কিছু আমলা। তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে চাঙ্গা করতে এমন অনৈতিক প্রস্তাব করেছে বলেও দাবি তাদের।

তাদের অভিযোগ, ফরাসউদ্দিন নিজেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক। গতবছর যেটি প্রায় ৪০ কোটি টাকা আয় করেছে। সেজন্যেই তার নেতৃত্বাধীন কমিশন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

শিক্ষকরা বলেন, প্রস্তাবিত অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষকদের পদমর্যাদা একধাপ কমিয়ে আনা হয়েছে। তাই শুধু বেতনভাতা নয়, তারা আন্দোলন করছেন পদমর্যাদা নিয়ে। শিক্ষকদের মতে, পদমর্যাদা কমিয়ে আনা হলে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় আগ্রহ হারাবে নতুন প্রজন্ম। এতে জাতি মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ও মর্যাদার দাবিতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন প্রায় ৪২ দিন ধর্মঘট পালন করেছিল।

Leave a Reply