যশোর-১ আসনে ১৭ বছর পর নৌকা-ধানের শীষ লড়াই

এস এম মারুফ, বেনাপোল প্রতিনিধি : যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে যশোর-১ আসন। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল এই আসনে অবস্থিত। এখানে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত প্রার্থীরা বিভিন্ন সময় জয়লাভ করলেও গত ১৭ বছরে লড়াই হয়নি নৌকা ধানের শীষের। দীর্ঘদিন পর এবার এখানে ভোটের লড়াইয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী। এর আগে প্রায় নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর জন্য এ আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। ফলে অনেক দিন পর এই আসনে নৌকা-ধানের শীষে লড়াই দেখা যাবে বলে ভোটাররা আশা করলেও তেমনটি দেখা যাচ্ছে না।

এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি আফিল গ্রুপের কর্ণধর শেখ আফিল উদ্দিন। তিনি এ আসনে টানা দুইবারের সংসদ সদস্য। এ কারণে জয় ধরে রাখাই হচ্ছে তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। এবার জয় পেতে মরিয়া দলটি।

এই আসনে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের তবিবর রহমান সরদার, ১৯৭৯ সালে বিএনপির আলী তারেক, ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির ডাঃ নজরুল ইসলাম, ১৯৮৮ সালে জামায়াতের এ্যাডভোকেট নূর হোসেন, ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের তবিবর রহমান সরদার, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির মফিকুল হাসান তৃপ্তি, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন আওয়ামী লীগের তবিবর রহমান সরদার, ২০০১ সালে বিএনপির আলী কদর, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের শেখ আফিল উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালে শেখ আফিল উদ্দিন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আসনটিতে আওয়ামী লীগ এখন শক্তিশালী অবস্থানে, বিপরীতে অনেকটাই অগোছালো বিএনপি। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৩ হাজার ৬শ‘৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৩৩ জন। আর নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩২ হাজার ১৫৫ জন। এ আসনে নারী ভোটার বেশি।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বিজয় নিশ্চিত করতে স্থানীয় ও জেলা উপজেলা নেতারা তৎপরতা চালাচ্ছেন। শার্শার সব কয়টি ইউনিয়নে ও বেনাপোল পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নৌকা প্রতীকের নির্বাচনী কার্যালয় খোলা হয়েছে। গভীর রাত  নেতাকর্মীর ভিড় লেগে থাকে সেখানে। কিন্তুু বিএনপি কোন ইউনিয়নে অফিস খুলতে না পারলেও নেতাকর্মীরা নিরাপদ স্থানে অবস্থান করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক আবুল হাসান জহির বলেন, ‘পুলিশ এখন আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বদলে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে বেশি ভূমিকা রাখছে।’ বিএনপির কর্মীরা ভোট চাইতে পারছে না। আওয়ামী লীগের লোকেরা তাদের বাধা দিচ্ছে। দেশে যতই উন্নয়ন হোক মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে পারলে বিএনপিই জয়লাভ করবে। মানুষ আর আওয়ামী লীগকে চাইছে না। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়।

অন্যদিকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতা মাওলানা আজীজুর রহমান নির্বাচন করেন। অবশ্য এ নির্বাচনে সামান্য ভোটে পরাজয় বরণ করতে হয় তাঁকে। এবারও তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এমন আশা ছিল দলটির কর্মী-সমর্থকদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপি নিজেদের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। এতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

শার্শা জামায়াতের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। আমরা জোটগতভাবে তাঁকে সমর্থন দিয়েছি। মাঠে নামতেই পারছি না। হামলা মামলার ভয় রয়েছে তারপরও আমাদের কর্মী-সমর্থকরা ধানের শীষে ভোট দেবে।

শার্শা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আলহাজ্ব নুরুজ্জামান বলেন, শেখ আফিল উদ্দিন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি, নির্বাচনী এলাকায় তিনি একক নেতা। এলাকায় আওয়ামী লীগ সংগঠিত। নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে একাট্টা। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে এমপি শেখ আফিল উদ্দিন নজিরবিহীন উন্নয়ন করেছেন। নিজ অর্থে রাস্তা, স্কুল-কলেজ নির্মাণ করেছেন। শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাতা-কলম দিচ্ছেন। প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছেন। শিক্ষার মান উন্নয়নে ছাত্র ছাত্রীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সংবর্ধনা দিয়েছেন। জুটমিল স্থাপন করে প্রায় ১০ হাজার নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বিপ্লব ঘটেছে। আর কর্মীরা চাকরি, চিকিৎসা, অনুদান যখন যা বলেছেন এমপি তাই করেছেন। শার্শার আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক তিনিই বাড়িয়েছেন। গত ইউপি নির্বাচনে ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টি ইউনিয়নে তার সমর্থক চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এসব ইউনিয়নে তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তার জয়লাভে যা ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। প্রতিটি এলাকায় জনসংযোগে শত শত এলাকার মানুষ তাকে সমর্থন দিচ্ছে।

বিএনপির প্রার্থী মফিকুল হাসান তৃপ্তি বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর এই আসনে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে ভোটাররা। তারা ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কিন্তু তাদের মনে শঙ্কা কাজ করছে। আওয়ামী লীগের ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ ও পুলিশি অ্যাকশনের কারণে তাঁর কর্মীরা মাঠে দাঁড়াতেই পারছে না। পুলিশ বিএনপির কর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি করছে। নানা অজুহাতে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করছে। তিনি বলেন, ‘এলাকায় বিএনপির মধ্যে বিভক্তি নেই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি বিপুল ভোটে জয়লাভ করব।’

আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ আফিল উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর ধরেই এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্রথম ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করতে না পেরে আমি এলাকা ছেড়ে যায়নি। শত নির্যাতনের মধ্যে কর্মীদের পাশে ছিলাম। গত ১০ বছরে নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিএনপির সময়ে এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয়নি। এখন সাধারণ মানুষ দুুই আমলের পার্থক্যটা বুঝতে পারছে। আবারও এলাকার মানুষ আওয়ামীলীগকেই বেছে নেবে।’ শার্শাকে আমি একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

উপজেলার শার্শা, নাভারন, বাগআঁচড়া, কায়বা, উলাশি, বাহাদুরপুর, বেনাপোল, পুটখালি, গোগা, নিজামপুর, লক্ষণপুর, ডিহি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গায় নৌকা প্রতীকের পোস্টারের আধিক্য। ধানের শীষের কোন পোস্টার চোখে পড়েনি।

পুটখালি খলসি বাজারে একটি চায়ের দোকানে কথা হয় সুলতান আহমেদ (৪৮) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবার নৌকার প্রচারণা বেশি। আর আমাদের এই ইউনিয়নে স্বাধীনতার পর থেকে নৌকা পাশ করে আসছে। এবারও পাশ করবে।

একই কথা জানান, কায়বা বাজারের আলী আহম্মেদ (৫০)। তিনি বলেন, আমরা নৌকায় ভোট দিব। এই এলাকার ৮০ ভাগ লোক আওয়ামী লীগ করে।

গোগার জামশেদ আলী (৪৫) জানান, আমরা বিএনপির সমর্থক। ভোটের দিন আমাদের ভোট কেন্দ্রের মাঠে যেতে আগেই নিষেধ করে দিয়েছেন ক্ষমতাসীনদলের নেতাকর্মীরা। দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। দেখা যাক কি হয়। পরিস্থিতি দেখে ভোটের মাঠে যাব।

শার্শা উপজেলায় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দেশের মতো স্থানীয় ভাবেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। পুলিশের অতি উৎসাহী মনোভাবে সাধারণ জনগণ ভোটের আনন্দ উপভোগ করতে পারছে না।’ এখানে একদলের নির্বাচন হচ্ছে।

শার্শা উপজেলা আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক) এর সাধারন সম্পাদক সাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সহিংসতা নেই। এটাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে তিনি মনে করেন। উপজেলায় মোট ভোটারের বেশি ভোট বিএনপি জামায়াতের। তা ছাড়া মোট ভোটারের একটি অংশ স্থানীয় নয়। এরাও এখানকার ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। যশোর-১ আসনে আওয়ামী লীগের যেমন একটি বৃহৎ ভোটব্যাংক রয়েছে, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটব্যাংকও রয়েছে। এই বিরোধী ভোটব্যাংক এখানকার সংসদ নির্বাচনে বরাবরই প্রভাব ফেলে।’